Skip to content Skip to sidebar Skip to footer

শিল্পরূপ (Shilparup), সংখ্যা: জানুয়ারি-মার্চ ২০১২ সংখ্যা

এ সময়ের অত্যন্ত ব্যস্ত ও খ্যাতিমান ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। দেশে এবং বিদেশে ভাস্কর হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন তিনি। ভাস্কর হিসেবে যেমন খ্যাতিমান, পেইন্টার হিসেবেও তেমনি রয়েছে তাঁর উঁচু আসন। বিশেষ করে হামিদুজ্জামানের জলরঙ এদেশের শিল্পী ও শিল্প সমঝদারদের কাছে খুবই সমাদৃত। শিল্প্রূপের এ সংখ্যায় তাঁর কাজ ও কর্মজীবনের নানা দিক পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন এ প্রজন্মের শিল্পী শাওন আকন্দ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১১, এশিয়াটিক সোসাইটি গ্যালারি, নিমতলী, ঢাকা। 

কৃতজ্ঞতা: পলাশ চৌধুরী, মাকসুদা স্বপ্না, অরণ্য

শাওন আকন্দ: স্যার আমি শুরু করবো একটু পেছন থেকে… আসলে এক সময় বাঙালি মুসলমান সমাজে তো ছবি আঁকার ব্যাপারে মানুষের আগ্রহ কম ছিল। ভাস্কর্যের কোন পরম্পরা তো ছিলই না। তা মধ্যে আপনি সেই কিশোরগঞ্জ থেকে কী করে ছবি আঁকার প্রতি উদ্বুদ্ধ হলেন- আর কী করেই বা শেষ পর্যন্ত ভাস্কর হয়ে উঠলেন? আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটা যদি আগে একটু শুনতাম তাহলে ভাল হতো।  

হামিদুজ্জামান খান: আমার জন্ম কিশোরগঞ্জের গচিহাটায়। গচিহাটা হলো একটা রেল স্টেশনের নাম। স্টেশনটা ফেমাস। জংশন স্টেশনের মতো। ছোটবেলা থেকেই আমার রেলের সাথে পরিচয়। আমাদের ঘড়ি ছিল রেল…মানে নয়টার গাড়ি আসতো…তো নয়টা বাজে। আগে তো ট্রেন চলাচল টাইমলি করতো। আর একটা মেইল ট্রেন ছিলো সেটা পৌছাতো বারোটার সময়। বুঝতাম রাত বারোটা। তো স্টেশনের সাথে আমার একটা লিংকেজ ছিল। আমাদের অঞ্চলকে বলা হয় ‘হাওরে’ অঞ্চল। কিন্ত রেল গেছে, উঁচু জায়গা দিয়ে। আমাদের জায়গাটা একটু উঁচু। ফলে দূরের গ্রামগুলো দেখা যায় না। জাস্ট হ্যাভ অ্যা লাইন। সমুদ্রের মতো। তো আমার বাড়িটা হচ্ছে হাওরের একদম কিনারায়। আমি ছোট বেলায় খুব স্বাচ্ছন্দ ফিল করতাম, কারণ আমার বাবা কোনোদিন পড়ার ব্যাপারে জোড় করতেন না। খেলাধুলা করেছি হেসে-খেলে বড় হয়েছি। আমার স্কুলের নাম বড়গ্রাম হাইস্কুল। খুব নামকরা স্কুল। তিন কিলোমিটার দূর। সেই স্কুল থেকে আমি ৬২ সালে মেট্রিক পাশ করেছি। মজার ব্যাপার হলো আমাদের স্কুলটা নীরোদ চৌধুরীর বাড়ির খুব কাছে। নীরোদ চৌধুরীর চাচার ছেলে আমাদের সঙ্গে পড়তো। সেই সুবাদে আমি নীরোদ চৌধুরীর বাড়ি কয়েকদিন পর পর যেতাম। গচিহাটা থেকে বড়গ্রাম, অনেক উচ্চ শিক্ষিত লোকজন ছিল এখানে, ফলে আমার মানস গড়নে অনেক সহযোগীতা পেয়েছি। তারপরে হেমেন্দ্র মজুমদারের বাড়ি আমার বাড়ির একদম পাশে…গচিহাটায়। 

শা আ: আচ্ছা।

হামিদুজ্জামান: হেমেন্দ্র মজুমদারের বাড়ি আমার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার। ওনার বাড়ি খুব সুন্দর, প্যাটার্ন একটু আলাদা ছিল। এক জায়গায় বাড়ি, এক জায়গায় মন্দির, এক জায়গায় ছিল রাস্তা, তারপর ওনাদের বাড়িতে একটা রথ ছিল। হেমেন্দ্র মজুমদারেরই করা এসব জিনিস। কালী মন্দির ছিল। কালীমন্দিরের ভেতরে যে কালী, এগুলো নিম কাঠের। আমরা উনার গল্ম শুনতাম। উনার ছবির ফ্রেম আমরা দেখেছি। অন্য ধরনের ফ্রেম করতো ছবির। আমার চাচার কাছে অনেকগুলো ফ্রেম ছিল। বলতো ওগুলো হেমেন্দ্র মজুমদারের ছবির ফ্রেম। বোধহয় ফোর্টিজের আগেই উনি মারা গেছেন। হেমেন্দ্র মজুমদারের ছবির বিষয়, ফিগার, শাপলা এগুলো কিন্ত এই গচিহাটারই।

শা আ: ছোটবেলায় কি স্যার আপনি ছবি আঁকতেন? 

হামিদুজ্জামান: ছবি আঁকতাম মানে স্কেচ করতাম। আমার মনে পড়ে, আমি একটা ড্রইং করেছি তাতে আমার এক দাদার মুখের আদলটা এসে গেছে। এতে সবাই খুব খুশি। তখন তো ছবি-টবি এত ছিল না। এটাই ঘরে ফ্রেম করে রেখে দিয়েছে। আমার বাবা খুবই ধার্মিক ছিলেন। কিন্ত আমার ছবি আকাটা পছন্দ করতেন। উনি হয়তো আমাকে কোন জায়গায় নিয়ে গেলেন…টাউনে, নিয়ে বলতেন, তুমি মসজিদের ছবি আঁকো, মসজিদের ছবি আঁকলাম। আমাদের কিশোরগঞ্জে বিরাট একটা মসজিদ আছে, খুব নামকরা। শহীদে মহজিদ বলে। তো উনি ইমামের কাছে আমাকে নিয়ে গেছেন, যে, আমার ছেলে এটা এঁকেছে, আপনাকে দিবে। আরে কী খুশি! তুমি মসজিদের ছবি এঁকে ফেলেছো, সুন্দর হয়েছে তো। এরকম ঘটনা কিছু ছিল। তারপরে আমি টাউনে গেলেই বলতাম, আমাকে রঙ কিনে দেন…ওয়াটার কালার রঙ, আব্বা কিনতে দিত। তখন আস্তে আস্তে গ্রো করলো। আমাদের ছিল হিন্দুপ্রধান। ভাল ভাল টিচার ছিল অনেক। 

শা আ: ড্রইং টিচার ছিল নাকি?

হামিদুজ্জামান: না, ছিল না। কিন্ত খুব এনলাইটেন্ড ছিল টিচাররা। ইন্ডিয়াতে যাওয়া-আসা করে। আমার জিয়োগ্রাফি সাবজেক্ট ছিল। আমি ড্রয়িং করার পরে সব ম্যাপ-ট্যাপ এঁকে দিতাম, এতে কিন্ত নম্বর অনেক বেড়ে যেত। তো টিচাররা একটু বুঝতো যে ছবি আঁকাটা আমার ভেতরে আছে। আর আমার আব্বা হেমেন্দ্র মজুমদারকে দেখেছেন। এটা খুব বলতো যে… এই লোক ছিল একটু পাগলা। লোকজনকে ধরে আনতো ড্রয়িং করতে। আমি আমার ফ্যামিলির মধ্যে একদম ছোট। স্কুলে যাওয়ার পথে দু’পাশের সবুজ প্রান্তর দেখতাম। কিছু পুরনো মন্দির ছিল, মঠ ছিল অনেক। খুব সুন্দর ডিজাইন, চিনামাটি দিয়ে করা, এগুলো আমি দেখতাম। এগুলো আমাকে উৎসাহিত করতো ছবি আঁকতে। স্কুল শেষ করলাম, আব্বার ইচ্ছে আমি সাইন্স নিয়ে পড়ি অথবা কমার্স নিয়ে, তো আমি ভর্তি হলাম ভৈরব কলেজে, ইন্টারমিডিয়েট করার জন্য। মাসখানেক ক্লাস করার পর এই সাবজেক্টটা আমার একদম ভালই লাগলো না। কঠিন মনে হয়, তো আমি সিলেটে চলে গেলাম। 

শা আ: ভৈরব কলেজ থেকে সিলেটে?

হামিদুজ্জামান: ইন্টারমিডিয়েটেও পড়ব না, পড়াশুনাও করবো না এগুলো নিয়ে। এরপর বাড়ি গেলাম। এমনি সময় আমি একটু খোঁজ-খবর নিয়েছি যে ঢাকাতে আর্ট কলেজ আছে। 

শা আ: এটা কোন সালের কথা? 

হামিদুজ্জামান: এটা সিক্সটি টু। আমি খোঁজ-খবর নিয়ে বাড়িতে গিয়ে বললাম যে ঢাকাতে একটা আর্ট কলেজ আছে… ওখানে যেতে চাই। আমাদের বাড়ির আশপাশে অনেক হিন্দু পরিবারের বসবাস। তাঁদের সাথে কথা বলে আরো একটু উৎসাহী হলাম। আমাদের ওখানকার পোস্টমাস্টার আব্বাকে বললেন, আপনার ছেলে চারুকলায় পড়বে? চারুকলায় আমি গেছি একবার, আপনি ওরে নিয়া যান। যদি ভাল লাগে, ভর্তি করান। এই প্রথম আমি আব্বার সাথে শহরে এলাম। ঢাকা তো আমার কাছে মস্ত বড়। আমি এসে সরাসরি আবেদিন স্যারের খোঁজে তাঁর শান্তিনগরের বাসায় গেলাম। উনি বারান্দায় বসে ছিলেন। এই প্রথম আমি জয়নুল আবেদিন স্যারকে দেখলাম ঢাকায় এসে। আমার বাবা সহজ-সরল লোক, বললো, ও তো চারুকলায় ভর্তি হতে চায়। আবেদিন স্যার বললেন, কালকে নিয়া আসো, আমি ভর্তি করিয়ে দেবো। আমি অনেক দেরিতে এসেছিলাম তখন অ্যাডমিশন হয়ে গেছে। তো বলছে ওর কিছুই লাগবে না। ইন্টারভিউ ছাড়া আবেদিন স্যার ভর্তি করতো না। আমাকে বললেন, কাগজ-পত্র যা আছে দেখাও। আমি দেখিয়েছি, ড্রয়িং-ট্রয়িং দেখে বললো যাও। আমি লিখে দিচ্ছি – অ্যাডমিশন দিতে বলছি। তারপর আমি এসে ভর্তি হয়ে গেলাম। এই ঢুকলাম চারুকলাতে। এসে দেখি সবাই তো স্মার্ট। ক্লাস করছে সবাই, ড্রয়িং-ট্রয়িং করে সুন্দর। দেখে আমি অস্থির হয়ে গেছি, খুব সুন্দর সুন্দর ড্রয়িং করে। আমি তো একেবারে সাদা-সিধা। আর একটু পিছিয়েও গেছি যেহেতু কোর্সটা শুরু হয়ে গেছে। তারপরে আস্তে আস্তে চেষ্টা করতে লাগলাম। … এভাবে ফার্স্ট ইয়ারটা গেলো, স্কেচ করতাম বেশি। 

শা আ: এ সময় শিক্ষক ছিলেন কারা? কাদেরকে পেয়েছিলেন?

হামিদুজ্জামান: মোস্তফা মনোয়ার ছিলেন আমাদের টিচার। আমি উনার ছাত্র। আমার একটু জেদ ছিল যে আমি কিছু করতে চাই। যেহেতু আমি পড়াশুনা বাদ দিয়ে এদিকে এসেছি। মনোয়ার স্যার আমাকে খুব বুঝতে পারতেন…আমি চেষ্টা করছি। একটা ঘটনা বলি, একদিন আমি ক্লাসে এসে ডংকিতে ঘুমিয়ে গেছি, ডংকি মানে তো বোঝো… ড্রয়িং করতাম। উনি বলছেন, ওকে ডেকো না, ঘুমাতে দাও। ওর স্কেচ খাতা কই…দেখে যে প্রচুর স্কেচ। রাতের বেলা হোল নাইট আমি স্টেশনে স্কেচ করেছিলাম। খাতাও প্রায় শেষ। দেখে উনি খুব খুশি হয়েছেন আর বলছেন, দেখেছ, এই ছেলে কিরকম ছিল আর কিছুদিনের মধ্যে কতটা চেঞ্জ হয়েছে। প্রচুর খাটে, কাজ করে। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি ক্লাসে কেউ নাই। আমি ঘুমিয়ে ক্লাস শেষ করি। তারপর আমার ক্লাসমেটরা বলল, স্যার তোমাকে খুব পছন্দ করেছে, তোমার কাজ দেখে ভাল বলেছে, আমাকে ডাকতে মানা করেছে বলে ডাকিনি। এটা আমাকে অনেক ইন্সপায়ার করেছে। আবেদিন স্যার আমাকে একদিন ডাকলেন। আমি তো ভয়ে ভয়ে গেছি। আবেদিন স্যারের সামনে যেতে আমাদের ভয়ই লাগত। যাওয়ার পরে উনি বলছেন, ‘তোমার এক্সিবিশনে যে কতগুলি ওয়াটার কালার আছে এগুলো আমরা ডিপার্টমেন্ট থেকে ফ্রেম করে দিচ্ছি।’ আমাদের প্রিন্ট মেকিং-এর অনেকগুলো বড় বড় ফ্রেম ছিল। টিচাররা ইউজ করতো মাঝে মাঝে। আমি গিয়ে দেখি যে আমার ছবিগুলো সব ফ্রেম করা। আমি যে কয়েকটা ওয়াটার কালার দিয়েছি আবেদিন স্যার বলেছে ওগুলো সব টাঙিয়ে দাও, নো সিলেকশন। তারপরে আবার আবেদিন স্যার আমাকে ডেকে বলছেন, ‘এই শোন, তোমার যে কয়েকটা ছবি আছে আমি কিনে নিলাম, এগুলো আমার।’ আমি বললাম, ‘আমার ছবি নিয়া আপনি কি করবেন?’ তো বলছে, ‘আমার যে বিভিন্ন গেস্ট আসে ওদেরকে প্রেজেন্ট করবো।’ তুমি অফিস থেকে পয়সা নিয়ে নাও। ইটস এ ট্রিমেন্ডাস ব্যাপার। তারপর বলেছে, ওয়াটার কালার তোমার দ্বারা হবে, তুমি ওয়াটার কালার ধরে রাখো, ভাল করবে।

তারপরে দেখা গেলো যে, দুই তিন বছরের মধ্যে সারা কলেজে আমার খুব নাম। 

শা আ: আপনি পেইন্টিং বিভাগেরই তো ছাত্র ছিলেন? 

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, পেইন্টিং বিভাগের। ওয়াটার কালারের জন্য পরিচিত হয়ে গেলাম। আমি তো অতটা বুঝি না। কিন্ত আমি বুঝি আমার গ্রামের পরিবেশ, সিমপ্লিসিটি সব মিলিয়ে আমি চিন্তা করতাম। অনেক সময় একটা সাবজেক্ট দেখলাম আর টোটাল একটা জিনিস মিলেমিশে করতাম, যা ডিফারেন্ট ছিল অন্যদের থেকে। ঐ সময় আমাদের আনোয়ার স্যার বলে একজন টিচার ছিলেন। 

শা আ: আনোয়ারুল হক।

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, আনোয়ারুল হক। উনি ছিলেন আবার ডিফারেন্ট। মনোয়ার স্যার এক রকম, আনোয়ার স্যার আরেক রকম। আনোয়ার স্যারকে আমি বলেছি, স্যার আমার কাজ দেখবেন?…আমি নিয়ে গেছি হোস্টেলে। উনি আবার সবাইকে একটু আদর-টাদর করত, থাপ্পড় মারত। আমি হোস্টেলেই কাজ দেখিয়েছি। ‘কিচ্ছু হয় না এগুলা, কিচ্ছু হয় না এগুলা, আপনার সব চেষ্টা বৃথা, এগুলা কিচ্ছু হয় না’- আমাকে বলে দিলো, ডিসগাইস করেছে খুব-ই…। বলে, ‘কালকে আমার বাসায় আসেনামি ছবি আঁকব, আপনি দেখবেন।’ তারপর গেলাম। উনি একদিন একটা ওয়াশ দিলো, আরেকদিন আরেকটা ওয়াশ দিলো, চার-পাচদিনে একটা ছোট্ট ছবি আঁকলো। বলে’…এ্যাই এখন এটা মার্ক করো’। আসলে আমার পার্সোনালিটি, আমি একটা জিনিস যে ওয়েতে চিন্তা করি…ওটা আমার সাথে যায় না। আমি একটা জিনিস মিনিমাইজ করে কাজ করি, করতে করতে কাজের মধ্যে একটা আলাদা ধরণ তৈরি হয়ে গেছে, যেটা মনোয়ার স্যার আবার খুব পছন্দ করতেন। ‘ওর ওয়াটার কালারের মতো কারো হয় না’- সবাইকে বলতেন। আমি যে একটু ডিফারেন্ট, মানে একটু ভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছি, আমার কাজের মধ্যে সিমপ্লিসিটি আছে, আমার পার্সোন্যালিটি আছে, এটা মনোয়ার স্যার আবিস্কার করেছে। আর উনি (আনোয়ারুল হক) ছিল একেবারে একাডেমিক টাইপের। একদম দূরে একটা জিনিস দেখা যায়, ঐটাও ছোট্ট করে একদম…যেটা আমার মনের সাথে মেলে না। ছবি তো ছবিই, একটা ইমোশান। মনোয়ার স্যারের ওয়াটার কালার, পিউর ওয়াটার কালার বলতে যে জিনিসটা ছিল, এটা মনোয়ার স্যারের মধ্যে আমরাও দেখি। এখন তো আমি বুঝি ওয়াটার কালারে কীভাবে কাজ করে …এখনও পর্যন্ত হি ইজ দ্য বেস্ট ওয়ান। এখনও চিন্তা করি উনি ওয়াটার কালারটা কীভাবে বুঝলেন। আমরা যে যাই করি শেষ দিকে সেটা ইলাস্ট্রেটিভ হয়ে যায়। ওয়াটার কালারের ফ্লেভার যেটা মনোয়ার স্যারের মধ্যে ছিল, এখনও আছে। উনার অনেক পুরোনো কাজ আছে খুবই সুন্দর, বিউটিফুল, জাস্ট ওয়াশ। ওয়াটার কালারটা ক্ষণিকের জন্য। ইটস লাইক… কবিতা লেখার মতো, যা হয়ে যাবে হয়ে যাবে, এটা নিয়ে ঘষা-মাজা করে কিছু করার নাই। এই কথাগুলো আসলে আমাদের শোনা কথা… উনার কথা। এইভাবে আমি তো পেইন্টিং করলাম। করার পর ফাইনাল ইয়ারে গিয়ে…আই হ্যাড এ ভেরি সিরিয়াস অ্যাকসিডেন্ট।

শা আ: ফাইনাল ইয়ারে?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, ফাইনাল ইয়ারে…আই অলসো হসপিটালাইসড এন্ড আই ওয়াজ অলসো ডাইং। যেহেতু আমাকে সবাই একটু ভালো বলে, আবেদিন স্যার মনে করেন যে সমস্ত কলেজের মধ্যে একটা ভাল স্টুডেন্ট। আমি আর মুনির ভাই…মনিরুল ইসলাম। মুনির ভাই আমার এক বছরের সিনিয়র। মনির ভাই প্রচুর কাজ করতো, আমিও কাজ করতাম। আবেদিন স্যারের এজন্য আমাদের প্রতি সিমপ্যাথি ছিল। তো আমি যখন অ্যাকসিডেন্ট করলাম আবেদিন স্যার আমার জন্য যথেষ্ট করলো। উনি বললেন দরকার হলে ওরে বিদেশ পাঠিয়ে দিবো। ডাক্তারদের বলছে, যা ট্রিটমেন্ট খরচ আমি দিচ্ছি, ওই ছেলেকে বাঁচাতে হবে। আমারও এমন সিরিয়াস অবস্থা…ব্রেইনে….অ্যাকসিডেন্ট করে মাথা প্রচন্ড ফেটে যায়, ব্রেইন আউট হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তাররা বলছে, না, এতো মারাই যাবে, চিকিৎসা করে কী লাভ? এই অবস্থা ছিল আমার! তারপরে ডক্টর আসিরউদ্দীন বলে একজন ছিলেন, উনি বললেন, আমি চেষ্টা করে দেখবো বাঁচে কিনা?…আর বাঁচলেও হয়ত মেমোরি থাকবে না। কারণ এ-তো ব্রেইন, তা আর কিছু করার নাই। হয়ত হাতটা প্যারালাইসড হয়ে যাবে। এই হাত প্যারালাইজড হয়ে গেছিল তখন। এ হাত উপরেই তুলতে পারতাম না। তারপর উনি চেষ্টা করলেন। আমার মাথার এদিকে ফুটা করে, আমার এদিকে ফুটা আছে, অনেক বড় ফুটা। রিভার্স ফুটা করে, ব্রেন ড্রিল করে, মাথার ব্লাডটা বের করা হলো, আমার যখন প্রথম সেন্স হলো তখন আবেদিন স্যার দাঁড়িয়ে আছে। -’কি আমারে চিনছো?’ দেখি যে আবেদিন স্যার, হঠাৎ করে আমার সেন্স ফিরেছে পুরোপুরি। বলছে, তুমি ভালো আছো, কোনো অসুবিধা নাই, তোমার জন্য আমি সব ব্যবস্থা করে দিছি। উনি ছেলেদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা অল্টারনেট ডিউটি করো, যাতে ওর কোন অসুবিধা না হয় কোন কিছু লাগলে। সারারাত ছেলেরা অল্টারনেট ডিউটি করেছে, খুব করেছে চারুকলার ছেলেরা। ইনশাল্লাহ আমার সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। এ হাতও আবার আস্তে আস্তে গেইন করতে শুরু করলো। এটা পুরা সেন্সে এখনও নাই, আমি ধরতে পারি সব, ব্যালান্সটা একটু কম…এ নিয়াও চলে, কাজ করলেও আমি একটা জিনিস সরাতে পারছি। 

শা আ: এটা কি স্যার বাম হাতে? 

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, বা হাতে। পরে আমি ভালো হলাম। হসপিটাল থেকে একটা পাগড়ি দিয়ে ছেড়ে দিলো। বলে দিলো এই পাগড়িটা সবসময় পরে থাকতে হবে। কারণ এটার ভেতরে তো স্কাল নাই। এটা যদি একটা কিছুর সাথে ধাক্কা লাগে, তো সরাসরি তোমার ব্রেনে চলে যাবে। তুমি পাগড়ি পরে থাকবে।  

শা আ: এটা কোন সময়ের কথা স্যার? 

হামিদুজ্জামান: এটা সিক্সটি নাইন। তো ভালো হবার পর আমি আসলাম চারুকলায়। হোস্টেলে যখন থাকলাম…তখন আমার ফাইনাল পরীক্ষার দুই মাস কি তিনমাস বাকি। সিক্সটি নাইনের জুনের দিকে। পরীক্ষার টাইম হয়ে গেছে তখন। আমি বললাম, পরীক্ষা দিবো। …এক্সিডেন্টের পরে আমার লাইফটা একটু অন্যরকম হয়ে গেল কারণ আমি তো মাসসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছি। তো ডক্টর আসিরউদ্দীন, মারা গেছেন উনি, উনি আমার জন্য যথেষ্ট করেছেন। উনার লাইফের সবচাইতে কঠিন পেশেন্ট ছিলাম আমি। আমাকে খুব আদর করতেন। প্রিন্সিপাল ছিলো মেডিকেলের। অনেক সময় আমাকে ডেকে বলেছেন, দাঁড়াও তোমার জন্য কিছু টাকা জোগাড় করছি। উনি অনেককে বলতো, ওর একটা ট্রিটমেন্ট দরকার। বিদেশে যেতে হবে, ইংল্যান্ড যেতে হবে, প্লাস্টিক সার্জারী দরকার। উনি ইংল্যান্ডের হেলথ সার্ভিসের ডাইরেক্টরকে আমার সব ব্যাপার নিয়ে লিখেছেন। তারপরে আমি ওয়াটার কালার করতাম, বিক্রি হত। চিটাগাং ক্লাবে গিয়ে আমি একটা এক্সিবিশন করলাম। অনেকগুলো ছবি মাউন্ট করে টাঙিয়ে দিলাম। সব ছবি সেইল, ওদের ক্লাবের যে চীফ…নারা সব ছবি নিয়ে গেলো, আমাকে অনেক টাকাও দিল। এই ওয়াটার কালার দিয়েই কিন্ত ট্রিটমেন্টও করলাম। কারণ টাকাতো অনেক লাগবে, আর ট্রিটমেন্টের কতো টাকা লাগবে আমি জানিনা? অনেক বেশি টাকা নিয়ে গেলাম, টিকিটও জোগাড় হলো। তো যাওয়ার সময় আমি একটা ফ্রি টিকিট পেলাম। ফ্রি টিকিট মানে আমি এখান থেকে জাহাজে করে যাবো। ইন্টারেস্টিং। সেই লেগেছে দেড়মাস। এটা আমার লাইফ চেঞ্জ করে দিলো। আমি সিলনে ছিলাম দুই দিন। সিলনে নেমে সিনেমা-টিনেমা দেখছি, ঘুরছি। তারপরে গেলাম আফ্রিকা। ডাকার বলে একটা জায়গা আছে, ওখানে গিয়ে তিনদিন জাহাজটা ছিল। আমি নিচে নেমে রেস্টুরেন্টে গেছি, চা খাচ্ছি, গল্প করছি, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছি। আমার তো কাজ নাই, ভিসা লাগতো না। আফ্রিকা আমি ভালো করে দেখেছি। আফ্রিকায় আমি একদিন বসে আছি, একজন ব্যাগে করে অনেকগুলো কার্ভিং নিয়ে আসছে। খুব সুন্দর, ব্ল্যাক কাটিং। আমি একটা কিনলামও। কি সুন্দর এইরকম স্কালপচার। যেগুলা আমি আবার আমেরিকা যখন গেলাম, তখন দেখি এগুলো মিউজিয়াম পিস। খুবই সুন্দর। আমি এরকম বড় একটা কিনলাম। আস্তে আস্তে স্কালপচারের দিকে মোটিভেট হতে শুরু করলাম। 

শা আ: ঐ সময় তো স্কালপচার ডিপার্টমেন্ট চালু হয়েছে। আপনি যখন যাচ্ছেন, যখন এখানে ছবি আঁকছেন, তখন তো রাজ্জাক স্যারেরা স্কালপচার ডিপার্টমেন্ট শুরু করেছেন। 

হামিদুজ্জামান: তখন ডিপার্টমেন্টাল একটা সাবজেক্ট শুরু করেছে।

শা আ: আলাদা করে ফুলফেজ ডিপার্টমেন্ট তখনও শুরু হয়নি?

হামিদুজ্জামান: মোটামুটি হয়েছে আরকি, আলাদা কোর্স চালু হয়নি। আচ্ছা আমি সিক্সটি নাইনে পাশ করলাম। কিন্ত জিদ করে আমি কোর্সটা শেষ করে বের হয়েছি। আমি যদি বাইরে চলে যাই…চিন্তা করেছি, ট্রিটমেন্ট তো আমার লাগবেই। এজন্য কোর্সটা যদি শেষ না করি…কোনকিছুই তো ঠিকমত হলো না। আমি অসুস্থ অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে দিলাম। মাঝামাঝি পাশ করলাম, খুব একটা ভাল রেজাল্ট করলাম না। আর আমার টিচাররা মানা করলো, যে পরীক্ষা দিয়ো না। কিন্ত আমি জিদ করলাম, পরীক্ষা দিবই। কারণ আমি জানি এখন শেষ না করলে পরে কোর্সটা শেষ হবে না। একটা ডিগ্রী তো আমার দরকার। আমার টিকিটটা ছিল খুব এক্সক্লুসিভ, গেস্টের টিকিট। তো আমাকে রুম দিলো শিপের মধ্যে, আমি বসে বসে ছবি আঁকতাম,স্কেচ করতাম, করতে করতে চলে গেলাম। দেড়মাস লেগেছে ডান্ডিতে পৌছাঁতে। ডান্ডি থেকে আসলাম এডিনবরায়, এডিনবরা হাসপাতালে আমার ট্রিটমেন্ট হবার কথা। তো ওখানে ট্রিটমেন্টের জন্যগেলাম। আমার অ্যাডমিশান সব রেডি করা ছিল। অ্যাডমিশন নিলাম, ঢুকার সাথে সাথেই আমার হিস্ট্রি নিলো। কালকেই তোমার অপারেশন…একদিন পরেই অপারেশন হলোমানে সার্জারী হয়ে গেলো। সার্জারী হওয়ার পরে কিছুটা প্রবলেম হয়েছিলো। এজন্য ওরা বলল, তুমি দেশে যাবে না, তোমাকে অ্যাটলিস্ট চার থেকে পাঁচ মাস ইংল্যান্ডে থাকতে হবে। এই আমরা লিখে দিচ্ছি, ভিসা-টিসার জন্য তোমার তোমার অসুবিধা নাই। তুমি যেয়ো না, তোমার কিছু প্রবলেম হলে আর কিছু করার থাকবে না। তোমাদের দেশে তো ট্রিটমেন্ট হবে না। এডিনবরায় থাকতে হবে না, তুমি একটু দূরেই থাকো কোন অসুবিধা হলে আমাদের ফোন করবে…আবার হসপিটালে আসতে হবে। তো আমি ইংল্যান্ডে চলে আসলাম। ইংল্যান্ডে এসে চারমাস থাকলাম। লন্ডনে। লন্ডনে যখন চারমাস থাকি, তখন তো আমার কোন কাজ নাই। আমি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে অনেকবার গেছি, ভিক্টোরিয়া আলবার্ট মিউজিয়াম, পোর্ট্রেট গ্যালারি, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, যত মিউজিয়াম, ঘুরতে শুরু করলাম। দেখি লন্ডনের বহু জায়গায় স্কালপচার আছে, আলাদা পার্ক আছে। তারপরে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দুনিয়ার সমস্ত কিছু আছে, আর আমার তো অফুরন্ত টাইম ছিল, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি। এটাতে হয় কি, দেখলাম স্কাল্পচার বাইরে থেকে। আমার মনে হয়েছে স্কাল্পচারের অনেক পাওয়ার। এরপরে আমি প্যারিসে আসছি। হাসপাতালের ওরা বলছে, তুমি চলে যাও। আমি এতদিন যে অসুস্থ ছিলাম। পরে ইংল্যান্ডের ডাক্তারের সাথে আলাপ করলে উনি বললেন তুমি চলে যেতে পারো, আর কোন অসুবিধা নাই তোমার। একটা টাইম আছে…সেটা চলে গেছে, এখন অ্যাডজাস্ট হয়ে গেছে। ফলে আমি আসার সময় প্যারিসে আসি। প্যারিসে ছিলাম দুই সপ্তাহ। প্রথমে আমি লুভারের কাছাকাছি একটা এক্সিবিশন হয়েছিল জিয়োকোমেটির…বড় এক্সিবিশন, তো ঐটা দেখলাম। আমি আস্তে আস্তে স্কাল্পচার দেখা শুরু করছি। তারপর লোক দেখছি, অনেক ভালো করে। তারপর ঐ মোমার্ত, আরও অনেক কিছু প্যারীতে ঘুরে ঘুরে দেখছি। একটা ব্রিজ, ব্রিজের সামনে একটা স্কাল্পচার, স্পট লাইটের সামনে স্কাল্পচার কিছুটা ল্যান্ডস্কেপে যেটা আগের জমানার…আশপাশে প্রচুর স্কাল্পচার। এগুলা কিন্ত আমাকে আস্তে আস্তে প্রভাবিত করছে। স্কাল্পচার তো খুব পাওয়ারফুল…বাইরে রাখা যায়, নেচারের ছোয়া থাকে। এটা আমাকে ইনফ্লুয়েন্স করে। পরে আমি ইতালিতে আসি। ইতালি তো স্কাল্পচারেরই দেশ। 

শা আ: আচ্ছা, এই প্যারিস বা ইতালি আসার কারণটা কি ছিল? জাস্ট দেখা- নাকি অন্যকিছু?

হামিদুজ্জামান: দেখা। যেহেতু আমি চারুকলা থেকে পাশ করে গেছি। ভিজ্যুয়ালি দেখা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ইতালিতে আসলাম, ইতালিতে দেখি এটা স্কাল্পচারেরই দেশ। সেন্ট পিটারে ঢুকছি…দেখি শত শত স্কাল্পচার। যেগুলা আমরা বইয়ের মধ্যে ইতিহাসে পড়েছি, আমাদের তো কোর্সে ছিল, দেখি সেন্ট পিটারে অনেকগুলাই আছে। মাইকেল অ্যাঞ্জেলো থেকে শুরু করে…সেই তোমার ফ্রেসকো, প্রচুর স্কাল্পচার। এগুলো দেখে-টেখে আমি একটু মানসিকভাবে স্কাল্পচারের দিকে ঝুঁকে পড়ি। ঢাকা আসলাম, আসার পরে আমাদের তখন ডিপার্টমেন্ট এইভাবে চালু হয়নাই। ডিগ্রী হয় নাই…ডিগ্রী হয়তো চালু হবে আরও দু-এক বছর পর, কিন্ত তখন আনোয়ার জাহান বলে একজন কাজ করত, হি বিকেইম এ টিচার…তখন থেকে আমি নাইট শিফটে কাজ করা শুরু করি। 

শা আ: আনোয়ার জাহান তো পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টের ছাত্র ছিলেন?

হামিদুজ্জামান: আনোয়ার জাহান পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে পাশ করেছে। তখন তো ডিগ্রী ছিল না। তখন আনোয়ার জাহানকে আমরা পাই, কাজ করেন। খালি কাঠ কাটে। তারপর আমি বললাম, আমি তো একটু স্কাল্পচার শিখতে চাই, তো বললো…করো। স্কাল্পচার মাটি দিয়ে শুরু করেছি। কিছুদিন পরে আবেদিন স্যার ডাকলো। আমাকে ডেকে বললো, তুমি জয়েন করো…টিচার। কোন ডিপার্টমেন্ট? স্কাল্পচার। আমি বললাম, স্যার আমি স্কাল্পচার পারিনা। বলে, ‘না, কিছু পারতে হবে না। তুমি এখন থেকে ক্লাস নিবা, তুমি ড্রয়িংটা দেখবা। আস্তে আস্তে স্কাল্পচার শিখা যাইবা।’ এই ছিল জয়নুল আবেদিন। আমাকে চাকরি দিয়ে দিলো, টিচার হয়ে গেলাম। তারপরে আমি ভাবলাম টিচার হয়েছি আমি তো স্কাল্পচারের কিছু জানি না। তারপরে নিজে নিজে কাজ করছি, যেহেতু টিচার হয়ে গেছি, স্কাল্পচার তো আমার কিছুই জানা নাই। দেশ স্বাধীন হলো…ইন্ডিয়ান স্কলারশিপ ওপেন হলো। তখন সেভেনটি ফোরে আমি একটা স্কলারশিপ পেলাম। আবেদিন স্যারই বললো, ‘তুমি স্কলারশিপের জন্য অ্যাপ্লাই করো, মাস্টার্স কইরা আসো।’ অ্যাপ্লাই করলাম। আবেদিন স্যার ছিল আমাদের জাজ, মানে সিলেকশন বোর্ডে। ইন্টারভিউ দিতে ঢুকছি দেখি আবেদিন স্যার চলে যাচ্ছে। বলি, ‘স্যার আমরা তো ইন্টারভিউ দিতে আসছি।’ তো বলে, ‘যাও, ইন্টারভিউ হবে না। তোমার ইন্টারভিউ লাগবেনা। আমি দেখছি কারা কারা অ্যাপ্লাই করছে, যারে যারে আমি মনে করছি দিছি, আমি সাইন কইরা দিয়া বলছি ওদের চইলা যাইতে বলেন, ইন্টারভিউ হবেনা। আমি সিলেকশন কইরা দিয়া চইলা গেলাম।’ এই ছিল আবেদিন স্যার। আমাকে এই কথাও বলল, তুমি গিয়া সুটকেস রেডি করো। পড়তে যাবা। তারপর আমি রেডি হলাম। খোঁজ-খবর নিলাম যে কোথায় গেলে ভাল হয় ইন্ডিয়ায়। তো অ্যামবাসিতে গেলাম, জানতে চেষ্টা করলাম, বরোদা হলো এখনকার সময়ের জন্য বেস্ট জায়গা…স্কাল্পচারের জন্য। বরোদা অ্যাপ্লাই করলাম, বরোদায় সীট নাই, বরোদায় একটু রাস। আমি বললাম, কখন পাওয়া যাবে? বললো, পরের বছর। আমি বললাম, সীট বুক করেন, পরের বছর বরোদায় যাবো। এজন্য আমি সেভেনটি থ্রিতে স্কলারশিপ পেয়ে গেলাম সেভেনটি ফোরে। বরোদা গেলাম, আমি তো এই টাইপের, যেটা ঠিক করি, সেটা আর পাল্টাতে চাইনা। আমি ফার্স্ট স্টুডেন্ট বরোদা গেলাম চারুকলা থেকে, এর আগে কেউ যায়নি। বরোদায় আর কেউ যেতে পারেনি। যাওয়ার পর বরোদায় আমি লোনলি ফিল করতে শুরু করলাম…ওখানে খাওয়া ভিন্ন, কালচারটা ভিন্ন, সবকিছু ভিন্ন। কিন্ত ইন্সটিটিউট ইজ ভেরি ভেরি কনটেম্পোরারি। ওদের ওয়ে অব টিচিং…ফ্রিডমটা বেশি। ছেলেরা স্কেচ করে…পরে আবার যা মনে চায় করে, তোমার মতো করে কাজ করো, এরকম বরোদা। ওখানে গিয়ে শঙ্খ চৌধুরীকে পেলাম। উনি আসতে। শঙ্খ চৌধুরীই বরোদা ফ্যাকাল্টি ওপেন করেছিলেন। ভেরি মডার্নিস্ট, কোর্স-টোর্স একেবারে অন্যরকম। ভিন্ন ধরনের, আমরা দেখতাম বছরে প্রচুর লোকজন আসতো, লেকচার দিতে, ওয়ার্কশপ করতে। 

শা আ: সুব্রামানিয়ানকে কি আপনি চিনতেন?

হামিদুজ্জামান: সুব্রামানিয়ান ছিলেন পেইন্টিং-এর। সুব্রামানিয়ান সরাসরি আমার টিচার না, তবে উনি তো সবার কাজ ঘুরে ঘুরে দেখতেন। …আমি কাস্টিং করতাম বরোদায়। যেহেতু আমি টিচার, সেজন্যই আমাকে মাস্টার ডিগ্রী করতে দিলো স্কাল্পচারে, নয়তো আমার ওখানে অ্যাডমিশন পাওয়ার কথা না, কারণ আমার বিএ তো পেইন্টিং-এ। যেহেতু আমি টিচার সেজন্য ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিলো, সব ওকে। আই ট্রাইড মাই বেস্ট। দু’বছর আমি প্রচুর চেষ্টা করলাম। ঐ ডিপার্টমেন্টে আমি সারা দিন কাজ করতাম। রাতে যেতাম বারোটা একটার সময়। ডিপার্টমেন্ট আমাকে প্রথমে বুঝতে পারলো আম খুব অ্যাটেন্টিভ। আমাকে খুলে দিলো ডিপার্টমেন্ট, চাবি দিয়ে দিলো, তুমি যতক্ষণ খুশি কাজ করো, তোমার জন্য ওপেন। তুমি যখন খুশি আসো কাজ করো, ফুলটাইম যব। কাজ করলাম প্রচুর, করে করে কাজের ডেভেলপমেন্ট হলো। টিচারও ভালো, ওরা আমাকে বুঝাতে পেরেছে স্কাল্পচারটা কি জিনিস? তো প্রচুর কাজ করলাম…কাজ করে করে ওখানে অনেকটা আলোচিত…এর কারণ হলো আমার খুব লাক ফেবার করেছে। আমি যখন ফাইনাল ইয়ারে, তখন বরোদার একটা এক্সিবিশন হয়, ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। ঐ ২৫ বছর হলো আমার ফাইনাল ইয়ারে। বোম্বেতে একটা এক্সিবিশন হয়। তো ওরা স্টোর থেকে ২৫ বছরে যারা যারা কাজ করে গেছে, ওদের কাজ বের করে, আর আমাদের কাজ নিয়ে একটা বড় এক্সিবিশন করে, বোম্বেতে, তাজ আর্ট গ্যালারিতে। ওখানে আমি কাজ দিলাম, তিনটা ছোট ছোট কাজ, একটা বড় কাজ। আমি তখন কাজ করতাম মুক্তিযুদ্ধ নিয়া। আমার একটা কাজ ছিল একজন মুক্তিযোদ্ধা, মানে রিয়েলিস্টিক না, তখন তো স্কাল্পচার বুঝে গেছি। কোন জায়গায় একটু খেয়ে গেছে… এরকম। তো আমি ভাবলাম, এটাকে আমি একটা কাপড় বিছায়ে শুয়ে দেই। আমি যেভাবে চিন্তা করি আরকি, আমি তো আমার মতো করে কাজ করার চেষ্টা করি। তো এটাকে একটা কাপড়ের মধ্যে শুইয়ে দিলাম। এই যে শুইয়ে দিয়েছি, ইটস এ ডাইনামিক। কারণ স্কাল্পচার কিন্ত তখনও স্ট্যান্ডিং…এর নীচে নামে নাই। স্কাল্পচার মানে একটা বেইস থাকবে, স্কাল্পচারটা রাখবে, এটাই। যা কাজগুলো সব স্ট্যান্ডের উপরেই। কিন্ত আমার কাজটা যেহেতু ফ্লোরে, ইট চেঞ্জড। ওখানে তখন পেপার-টেপারে নিউজ-টিউজ আসলো, হামিদুজ্জামান হ্যাজ কাম ফ্রম বাংলাদেশহি হ্যাজ ওন ডিরাইভড স্টাইল। এটা কিন্ত সবার চোখে আসলো, কারণ লিখছে ওখানকার মেজর কাগজে, যেগুলো খুব ইম্পর্ট্যান্ট পেপার, বোম্বে-টোম্বেতে। ওরা আমাকে খুঁজতে শুরু করলো। ইভেন, এম এফ হুসেইন এসে জিজ্ঞেস করলো, হু ইজ হামিদুজ্জামান? আমার অন্য কাজ ছিল, আমি একটা ঠেলাগাড়ি করছিলাম, সেটাকে আমি গ্রামের সাথে রিলেট করছি। দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ি ঠেলছে লোকগুলো। আবেদিন স্যারের অনেক ড্রয়িং আছে এরকম। এগুলো আমি স্কাল্পচারে আমার মত করে করলাম। আমি তখন একটা সিস্টেম ডেভেলপ করলাম। আমি ওয়াক্স-এর অনেক স্ল্যাব বানাতাম, এগুলো আমি কেটে কেটে লাগিয়ে লাগিয়ে স্কাল্পচার করতাম। এগুলো আবার কাস্টিং করতাম। 

শা আ: আচ্ছা, মেটাল কাস্টিং? 

হামিদুজ্জামান: মেটাল কাস্টিং। রিকশা, ঠেলাগাড়ি, অনেক কাজ করলাম মুক্তিযুদ্ধের উপরে। কিছু প্লাস্টারের বড় কাজও করলাম। আমার কাজ ঐ সময় ভিন্ন রকম হয়ে গিয়েছিল। আমাকে কয়েকজন বললো, হুসেন তোমাকে খোঁজ করেছে এবং নম্বর দিয়ে গেছে। বলেছে, ওকে ফোন করতে বলবে। হুসেন আমার সাথে দেখা করবে এটা কম কথা না। তারপর আমি ফোন করলাম, বললো, ‘ইয়েস, আই লাইকড ইউর ওয়ার্ক, ইউ ওয়েট…আই এ্যাম কামিং।’ তারপরে উনি আসলেন। পরিচিত হলাম, কথা বললাম। একটা ক্যাফেতে দু’জনে মিলে গল্প করলাম। উনি আমাকে ইন্সপায়ার করলো, যে তোমার কাজের মধ্যে ডিফারেন্ট একটা জিনিস আছে, ইনোভেটিভ একটা জিনিস, তোমার মতো। ভারতীয় সব স্কাল্পচার কোথায় যেন একখানে মিশে। যেহেতু আমি একটা অন্য এলাকার, অন্য জায়গার, আমার তো কোন ব্যাকগ্রাউন্ড নাই। আও ওয়াজ ফ্রি। আর ছোটবেলা মানুষ হয়েছি ঐভাবে, এজন্য একটা সুযোগ ছিল আমাদের। স্কাল্পচারের মধ্যে একটা মুক্তমন নিয়ে কাজ করতাম। একটা গেল একটা ঘটনা। ওখানে তো অনেকের কাজ ছিল। ২৫ বছর তো, যারা এখন খুব নামকরা ইন্ডিয়াতে, কোলকাতায় যারা মাস্টার্স করতো, এদের কাজ। সবার মধ্যে আমি আলোচিত। তখন আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেল, যে আমার দ্বারা হয়তো কিছু হবে। আমি রেজাল্ট খুব ভাল করলাম। ওরা আমাকে বললো, উই উইল গিভ ইউ অ্যানাদার থ্রি ইয়ার স্কলারশিপ, তুমি এখানে থাকো। পিএইচডি করো। 

শা আ: ডক্ট্ররিয়াল কোর্স?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ। তখন চারুকলা সরকারি ছিল। যার জন্য থাকা সম্ভব ছিল না। আমি বললাম, চলে যেতে হবে, থাকতে পারবনা। ওরা আমাকে আটকাতে চাইছিলো। অ্যানি হাউ তুমি থাকো কয়েক বছর, তুমি আরও ভাল করতে পারবে।আমি চলে আসলাম, আবার জয়েন করলাম চারুকলায়। তখন ইন্ডিয়াতে খুব বেশি ইক্সিবিশন হয়- তা না। একটা বড় এক্সিবিশন ছিল, ১০০-১৫০ স্কাল্পচারের একটা বড় গ্রুপ এক্সিবিশন, দিল্লীতে। ওখান থেকে আমি আমন্ত্রণ পেলাম যে, তোমার স্কাল্পচার আমরা চাই। দিলাম স্কাল্পচার। আমার স্কাল্পচার দ্বিতীয় হলো, বিক্রি হল, টাকাও পেলাম। সব মিলিয়ে রেসপন্সটা ভালো ছিল। তারপর ঢাকা আসলাম। আবার জয়েন করলাম। তখন তো আমি স্কাল্পচারটা একদম বুঝি। 

শা আ: বরোদায় আপনি কি শুধু কাস্টিংই শিখেছেন না আরও অন্যকিছু শিখেছেন?

হামিদুজ্জামান: আমি মিক্সড মিডিয়ায় কাজ করতাম। তখনকার সময়ে ইন্সটলেশন টাইপের কাজ করতাম, মিক্সড মিডিয়া। কাস্টিংটা ছিল আমার কোর্স। 

শা আ: মিক্সড মিডিয়া বলতে কি?

হামিদুজ্জামান: মিক্সড মিডিয়া বলতে আমি বুঝতাম পরিবেশ। তখন ধরো ইনস্টলেশন কথাটা পপুলার হয় নাই। আমি হয়তো এনভাইরেনমেন্ট তৈরির চেষ্টা করতাম। যখন আমি শুনলাম আমাদের একটা দ্বীপের সমস্ত লোককে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, হাউ আই ক্যান রিপ্রেজেন্ট… এত বড় দ্বীপের লোকজনদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এটা সিম্বলিক্যালি কী করে আমি রিপ্রেজেন্ট করতে পারি? আমি একটা বেড তৈরি করলাম, মনে হচ্ছে একটা বিচ বা স্যান্ডিল্যান্ড, সেখানে…একটা ছোট বাচ্চা আহত, তারপর ঐ এনভাইরনমেন্টের জন্য যা যা দরকার খুঁজে খুঁজে নিয়ে আমি করলাম। আমাদের মিউজিয়াম ছিল এটা অনেকদিন, এখন হয়তো নাই। এটার জন্য আমি শিল্পকলা অ্যাওয়ার্ডও পেলাম। এই ধরণের কাজও করতাম আমি। পিউর ইনস্টলেশন। সেভেনটি সিক্সের জুনে অথবা ডিসেম্বরে আমাদের শিল্পকলা প্রথমবারের মতো একটা গ্রুপ শো করলো স্কাল্পচারের।

শা আ: তখন তো শিল্পকলা কেবল হয়েছে?

হামিদুজ্জামান: সেভেনটি সিক্সে একটা গ্রুপ শো করলো। 

শা আ: আচ্ছা আচ্ছা, ঐ ভাস্কর্য পরিষদের শো-এর কথা বলছেন? প্রথম ভাস্কর্য প্রদর্শনী যেটা।

হামিদুজ্জামান: তখন তো স্কাল্পচারের উপর একটা এক্সিবিশনের কথা বলছিলো। ওরা আয়োজন করলো, যে যা স্কাল্পচার পারে। তখন তো স্কাল্পচার তেমন কেউ বোঝে না। তখন ৫০-৬০ জনের মতো…পেইন্টাররাও…কাটিং কিছু করে-টরে…আনোয়ারুল হক , আনোয়ার জাহান, রাজ্জাক স্যার, আবদুল্লা খালিদ আরও অনেকেই যারা কাজ করে, সবার কাজ নিয়ে। তখন আমার স্কাল্পচার একটা স্ট্যান্ডার্ড-এ দাঁড়িয়ে গেছে। একটা ব্রোঞ্জ কাস্টিং ছিল, ইন্ডিয়াতেই করেছি, নিয়ে এসেছিলাম। এক্সিবিশানে দিলাম, ওটাতে আমি ন্যাশনাল বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পেলাম। এগুলো করে আমি আস্তে আস্তে স্কাল্পচারের মধ্যে ঢুকে গেছি। এরপরে আরো দুটো এক্সিবিশন হলো। একটা হয়েছে এইট্টিটুতে, গ্রুপ এক্সিবিশন। তখন আমি দেশে ছিলাম। এইট্টিটুতে একটা বড় এক্সিবিশন করলাম চারুকলাতে। নিচের দুটো গ্যালারি, উপরের দিকে এখন যেটা লাইব্রেরি তখন সেটা গ্যালারি ছিল, এটা…তারপরে কিছুটা বাইরে কাজ দিলাম, প্রায় সব স্কাল্পচার, মেটালের কাজ সব, কিছু ইনস্টলেশন। একটা ইনস্টলেশন করলাম বালি দিয়ে। কিছু ইনস্টলেশন করলাম রুমটা অন্ধকার করে। এই এক্সিবিশনটা খুব সাড়া পড়লো। লোকজন পছন্দ করলো খুবই। 

শা আ: আমরা স্যার এই জায়গাটায় পরে আসবো, একটু পেছনে ফিরে যাই। এই যে আপনার কাজগুলো দেখছি সেভেনটিজ, এইটিজ-এর কাজগুলো, যেগুলো নিয়ে আপনি পুরস্কার পাচ্ছেন, তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে আপনার কাজে স্কাল্পচারই প্রধান। আর আপনার এইসব কাজের বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন রকমের অনুষঙ্গ। বিষয়বস্ত হিসাবে সেটাকে আপনি নানাভাবে প্রেজেন্ট করেছেন। তো মুক্তিযুদ্ধকে বিষয়বস্ত হিসেবে নেয়ার পেছনের কারণটা কি – সেটা আমার জানতে ইচ্ছে করে।

হামিদুজ্জামান: আমি ৭৪ সালে ইন্ডিয়া গেলাম, আমাকে টিচার জিজ্ঞাস করলো, তুমি কি বিষয়ে কাজ শুরু করবে? সাবজেক্টটা কি? কী ভাবছো? তখন আমি বলি আমার দেশের সবচেয়ে বড় ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। এগুলো আমার মাথার মধ্যে কাজ করছিল। আমি স্কাল্পচারের যে মিডিয়াতে কাজ করি না কেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে চাই। আমি টিচারকে বললাম যে, সাপোজ…মা ওয়েট করছে ছেলের জন্য। আমি টিচারদের সাথে আলোচনা করতাম যে মাদার এক্সপ্রেশন কীভাবে ঢুকাবো তার মধ্যে। স্টীল মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে…পাঁচ বছর হয়ে গেছে…মা তো এখনও ছেলের জন্য ওয়েট করছে। এগুলো নিয়ে আমি আলোচনা করতাম টিচারদের সাথে যে, এগুলো কীভাবে এক্সপ্রেস করবো? মুক্তিযুদ্ধকে হাইলাইট করতে চাই, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধটা হচ্ছে যখন, আমি তখন টগবগে জোয়ান, মানে ইয়াং। 

শা আ: মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতি যদি বলেন, তাহলে রিলেট করতে সুবিধা হয় আমাদের জন্য। 

হামিদুজ্জামান: আমি তো ঢাকায় ছিলাম ঐ টাইমটায়। রাত্রির বেলা আর্মি ঢুকলো আমার রুমে। 

শা আ: আপনি কোথায় থাকতেন? 

হামিদুজ্জামান: আমি সেনের বাগে ১টা রুম নিয়ে থাকতাম। টেলি সামাদ থাকত আমার পাশাপাশি বাসায়। তাঁর সাথে আমার খুব যোগাযোগ ছিল। ডেইলি দেখা হতো। যখন যুদ্ধটা শুরু হয় সাথে সাথে টেলি সামাদ, বউ বাচ্চা নিয়ে চলে গেলো। আমাকে বললো, তুমি আমার বাড়িতে থাকো। আমি আমার এক ভাইয়ের ছেলেকে নিয়ে থাকি। দুইজনেই আমরা ইয়াং। একদিন রাতে দুইটা-আড়াইটার সময় দেখি পাঁচ-ছয়টা আর্মি এসে কি সব বললো-টললো, তুমি কি করো? আমরা আগে থেকে ঠিক করে দেখেছিলাম কেউ কিছু বললে বলবো, এই রং-টং নিয়ে কাজ করি। যদি শোনে স্টুডেন্ট, পাশ করেছি ইউনিভার্সিটি থেকে, সাথে সাথে মেরে ফেলতে পারে। আমাকে পেছন থেকে ধরলো, প্রায় গুলিই করে এই অবস্থা। পরে সবগুলো ভেতরে ঢুকলো, বাড়ি সার্চ করলো। উল্টা-পাল্টা করলো সব, মানে আর্মস-টার্মস কিছু আছে কিনা? তারপর…বললো, তুমকো ছোড় দিয়া। বলে জোরে ধাক্কা দিয়ে বাইরে চলে গেলো। যাওয়ার সময় ওরা টুইন ওয়ান, ইস্ত্রী এগুলো নিয়ে গেছে। পাশের বাসায় ঢুকে অত্যাচার করছে, তাদের মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এগুলা আশপাশে হচ্ছিল, এই টাইমটা মানে খুব ক্রুশিয়াল টাইম। 

শা আ: কোন সময়?

হামিদুজ্জামান: এগুলো হলো কার্ফিউ ছাড়ার ব্রেকগুলা। ২৫শে মার্চের রাতের পর ২৬, ২৭। তখন কার্ফিউ দিতো। কার্ফিউ দুই ঘন্টার ব্রেক করতো। তখন লোকজন বের হতো। 

শা আ: ঐ সময় আর্ট কলেজকেন্দ্রিক, আর্ট কলেজের স্টুডেন্টরা, টিচারদের কিছু অ্যাকটিভিটিজের কথা শুনি, এগুলার সাথে কি আপনার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল?

হামিদুজ্জামান: আমি যখন এরকম একটা ধাক্কা খেলাম, তার পরের দিন আমার ভাইস্তাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। নিউ মার্কেটের দিকে আসলাম হাঁটতে হাঁটতে।

শা আ: এই ২৫ তারিখের আগের কথা বলছি স্যার। ২৫ তারিখের ক্র্যাকডাউনের আগে যে আর্টকলেজকেন্দ্রিক কিছু কিছু, ওই যে একটা মিছিলের কথা শুনি স্যার…যে, আর্ট কলেজ থেকে একটি মিছিল বেরিয়েছিলো, জয়নুল আবেদিনও ছিলেন, আরও অনেকে ছিল। এগুলো সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন কিনা?

হামিদুজ্জামান: না, এর মধ্যে আমি ছিলাম না। চারুকলার থেকে আমার বাসাটা ছিল অনেক দূরে। যার জন্য আমার যাওয়া-আসা করতে অনেক টাইম লাগতো। চারুকলা আসতাম, টিচার তো, আমার কাজগুলা, ক্লাসের কাজগুলা করে আবার চলে যেতাম। মানে অন্য এক্সট্রা অ্যাকটিভিটিজের সাথে আমি থাকতাম না। আর তখন তো আমাদের হাতে বাড়তি কোন পয়সা-কড়ি নাই, জাস্ট টিচার, টিচারের বেতন হলো তিনশ’ টাকা। এটা দিয়ে বাসা ভাড়া, মানে একটু ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে চলি তখন। কোন বাড়তি কিছু করার মত আমাদের সুযোগ ছিলনা। ২৫, ২৬, ২৭ তারিখে একটু লম্বা কার্ফিউ ছেড়েছে, তখন আমরা বেরিয়ে পরেছি। কোন জায়গায় হয়তো ডেডবডি পড়ে আছে, কুকুরে খেয়ে ফেলছে, এরকম অবস্থা। তারপর আমরা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, পেটটা একটু ফুলে আছে, মানুষের। আমি দেখছি, স্বচক্ষে। এগুলো পরে আমার স্কাল্পচারে এসেছে। নদী পার হয়ে একটা ট্রাক পেলাম, ট্রাকের মধ্যে উঠলাম। 

শা আ: নদীর ওপারে?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, নদীর ওপারে। ট্রাকে উঠে নরসিংদীর কাছাকাছি গেলাম। ওখানে নামিয়ে দিলো। আর কোনো রাস্তাই নাই যাওয়ার। আমার বাড়ি তো তখনো অনেক দূর। হয়তো এখনও প্রায় ১০০ কিলোমিটার। আর্মিরা ঘুরছে, যাকে খুশি ধরে নিয়ে যায়। আমরা নৌকা দিয়ে পার হয়ে একটু গ্রামের দিকে যেতে চেষ্টা করলাম। যেতে যেতে অনেক পরিচিত লোকের সাথে দেখা হয়েছে। তখন একটা গ্রুপের মত হয়ে গেলো। আর আমাদের একটাই উপায় হলো হাঁটা। তারপর নৌকা দিয়ে পার হয়ে ভৈরব গেলাম। ভৈরব থেকে আমার বাড়ি সে ধরো পঞ্চাশ কিলোমিটার। পুরাটাই হাঁটলাম। পা-টা ফুলে যাওয়ার মত অবস্থা। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে যাই। বাড়িতে গিয়ে কয়েকদিন একটু ভালো থাকলাম, মানে আগে যেমন গ্রামে-ট্রামে থাকতাম, সবার সাথে মিশে থাকতাম। আব্বা-আম্মা খুশি, কারণ ওরা তো শুনছে ঢাকা শেষ, খুব কষ্টে ছিলো। তারপর বাড়িতে কিছুদিন খুব ভালো ছিলাম। আমাদের বাড়িটা যেহেতু স্টেশনের কাছে, একদিন আমাদের গ্রামে আগুন দিলো। আমরা পালালাম। আমিও ওদের সাথে দৌড়তে দৌড়াতে বহুদূর চলে গেলাম। এগুলা তো আমি চোখে দেখেছি। 

শা আ: এইসব অভিজ্ঞতার কি একটা প্রভাব আছে বলে মনে হয় আপনার ভাস্কর্যে?                           

হামিদুজ্জামান: যখন আমি স্কাল্পচার করতে শুরু করছি এই জিনিসগুলাই প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি আমার স্কাল্পচারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি কাজ করলাম ধরো আট থেকে দশ বছর। 

শ আ: কোন সময় এটা? সেভেনটি ফোর-ফাইভ থেকে শুরু করে…

হামিদুজ্জামান: সেভেনটি ফোর-ফাইভ থেকে শুরু করে এইটটি ফোর পর্যন্ত। যেহেতু আমি তখন স্কাল্পচারটা বুঝি, তারপর আস্তে আস্তে একটু ফর্মের দিকে চলে গেলাম। 

শা আ: এই ফর্মের দিকে আপনি কোন সময় এবং কী কারণে গেলেন? 

হামিদুজ্জামান: এইটটিতে আমাকে বঙ্গভবন থেকে একটা স্কাল্পচার করতে বললো। যেহেতু আমি একজন টিচার, তারপরে আমি একটু ট্রেইনড, যার জন্য খোঁজ করে আমাকেই বের করলো যে, ও ইন্ডিয়ায় পড়াশোনা করেছে, মাস্টার্স করেছে, স্কাল্পচারে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে, তারপর কাজ খুবই ভালো। এজন্য সাম হাউ কেউ হয়তো বলেছে, ও পারবে। আমাকে…বঙ্গভবনের জাস্ট সামনে…একটা ফোয়ারা আছে। এগুলো সব ভিজ্যুয়াল আর্কিটেক্টদের ডিজাইন করা ফর্ম, আমাকে বলা হলো এখানে একটা স্কাল্পচার বানিয়ে দিতে হবে। এটা তো আমার প্রথম দিকের, মানে এতবড় কাজ ফাউন্টেনের উপরে স্কাল্পচারটা থাকবে…এরকম…একটা কিছু। আমাকে ডেকে বললো, আপনাকে এটা করতে বলা হয়েছে। তো আমি মডেল বানালাম, সাইটের কাজগুলোয় আমার তো আর অতো ধারণা নাই। তখন আমি একটু ডিজাইন করে দিলাম পরে উনারা আবার…এখনও আছে, একটা ওয়ালের মতো আছে, খুব সুন্দর, এইরকম করে ডিজাইন, ড্রয়িং করে দিলাম, পরে ওরা পাথর লাগিয়ে জিনিসটা খুব সুন্দর করে করলো। তখন কিন্ত এইসব পাথর-টাথর লাগানোরও লোক ছিল না ঢাকাতে। যার কারণে শুধু এটা করতে অনেকদিন লাগলো। কাস্টিং করলো। তখন আমাকে ইঞ্জিনিয়াররা খুব হেল্প করলো, প্রাধান্য দিলো। আমি যা বলছি সেটাই করে জিনিসটা করলো আর সেন্টারলি আমি স্কাল্পচারটা বানালাম। তখন আমার যেটা সুযোগ ছিল…সেটা হলো কি…আমি এম.এ পাশ করার পর তখন তো আমার টাকা-পয়সার খুবই ক্রাইসিস। আর বিয়েও করলাম। তো একটা ছোট্ট এক রুমে থাকি। আর স্কাল্পচার করার জন্য তো অনেক জায়গা লাগে, একটা স্পেস লাগে, একুলো কিচ্ছু ছিল না। আমিনুল ইসলাম স্যার তখন প্রিন্সিপান চারুকলার, উনি আমাদের চারুকলার পেছনের দিকে যে আর্ট হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট, ক্যান্টিনের পাশে এই বাড়িটা ছিলো মেয়েদের হোস্টেল। উপরে মেয়েরা থাকতো, নীচে থাকতো প্রিন্সিপাল। শফিকুল হোসেন রিটায়ার্ড করলো। রিটায়ার্ড করার পরে আমিনুল ইসলাম প্রিন্সিপাল হলেন কয়েক বছরের জন্য। 

শা আ: এটা তো সত্তর দশকের কথা?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ হ্যাঁ, সত্তর দশকের। আমি বলছি সেভেনটি সিক্সের কথা। 

শা আ: বরোদা থেকে ফিরে আসার পর?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, আমাকে তো বঙ্গভবনে কাজ দিলো, আমি আমিনুল ইসলাম স্যারকে বললাম, স্যার আমাকে বিরাট কাজ দিয়েছে। এটা আমাকে করতে হবে। আমিনুল ইসলাম স্যার অফিশিয়ালি এই মেয়েদের হোস্টেলের নীচে থাকার বাড়ির যে জায়গা, যেহেতু উনি প্রিন্সিপাল ছিলেন এটা উনার থাকার কথা। তো উনার ওয়াইফ বললো, এইরকম বাড়িতে আমি থাকবো না। এটা অন্য কোন টিচারকে দিয়া দাও। উনার নিজের বাড়ি আছে, মালিগাবে। উনি সিলেক্ট করলো আমাকে। একটু কন্ট্রাডিকটরি ছিল কারণ অনেক সিনিয়ার টিচার ছিলো। বলছে না, ও যখন কাজ-টাজ করে আমি ওকে দিতে চাই। উনি আমাকে ডেকে বলছেন তুমি উঠে পড়ো। স্যার তো একটু এরকম ছিলো, উনার কমন্ডাও ছিলো। এই যে উঠলাম, নীচের তলায় বেশ কয়েকটা রুম…চার-পাঁচটা রুম। আমি ঐ টাইমে কাজও পেয়েছি। মেটাল শিট, পিতলের…ব্রোঞ্জ শিট দিয়ে করবো। পাখি থেকে ডিজাইনটা নিলাম। একটা স্ট্রেইট লাইনে পাখিটাকে একটু আধুনিক করে, তিনটে পাখি করে, আমি বলছি ফ্যামিলি। বার্ড ফ্যামিলি। ফলে তিনটে পাখি দাঁড় করালাম, একটু স্ট্রেইট লাইনে, মডেল করলাম, মডেলটা সুন্দর হয়েছে। তারপর এটাকে এনলার্জ করলাম। আর্কিটেক্টরা আমাকে হেল্প করলো ফলে জিনিসটা খুব সংগঠিতভাবে হলো। স্ট্রাকচার ইঞ্জিনিয়ার হেল্প করলো যাতে এটা অনেকদিন টেকে। আর জায়গাটা ছিলো খুব ইম্পর্টেন্ট। বঙ্গভবনের একদম ফ্রন্টে। এটা মি টাইম নিয়ে মডেল করে, ভালোভাবে করার চেষ্টা করলাম। মনোয়ার স্যারের কথা বলি, মনোয়ার স্যার বললো, হামিদ, তোমাকে এতো সুন্দর জায়গায় কাজ দিয়েছে? তুমি এটা ভালো করে করার চেষ্টা করো। আমি যথেষ্ট চেষ্টা করলাম। এদিক দিয়ে…এটা আমার সুযোগ যে আমাকে এখানে থাকতে দিয়েছে। তা না হলে এসব কাজ আমি করতে পারতাম না। কারণ ব্রোঞ্জের পিসগুলো ২৪ ফিট বড়, তিনটে স্ট্রাকচার, তার মানে আই নিড লটস অফ মেটেরিয়ালস। মেটেরিয়ালসগুলো আমি কোথায় রাখতাম? ওরা এসে, তখনকার সময়চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার মেটেরিয়াল কিনে আমার ঘরে দিয়ে গেলো। আমি যা চাইলাম দিয়ে গেলো। তখন কিন্ত আমার অসুবিধা হয় নাই। কাটতে শুরু করলাম, ধীরে ধীরে স্ট্রাকচারের ক্টহামো করে। ইঞ্জিনিয়াররা আমাকে হেল্প করলো। লোকাল ওয়েল্ডার নিলাম, নিয়ে ওখানে বসালাম। এখন তো এটা একটা আধুনিক স্কাল্পচারের এগজাম্পল। 

শা আ: তখন আমাদের এখানে কিছুই গ্রো করে নাই?

হামিদুজ্জামান: না, কিছুই গ্রো করে নাই। এটা যখন বসালাম, যাদের জন্য করলাম, দে ডোন্ট লাইক ইট। এখানে তো সবচাইতে হাইস্ট লেভেলের লোকজন আসে, মিনিস্টার আসে, সেক্রেটারি আসে, তো  ওরা এটা পছন্দ করলো না। ওরা বললো, এটা ঠিক বকের মতো হয় নাই। তখন কিন্ত স্কাল্পচারের জ্ঞানটাই কম। একটা তো পেছনের টান আছেই, স্কাল্পচারের গ্রহণযোগ্যতা নাই, তারপরে ঐ জ্ঞানটাও নাই, স্কাল্পচার কী হওয়া উচিত? আর যেহেতু আমি একেবারে ট্রেইনড। ইন্ডিয়ায় আমি তখন ট্রাভেল করছি অনেক, বহু জায়গায় গেছি, আমি তো মোটামুটি একটা ট্রেইনড লোক। আমার মনে সাহসও ছিল, আমার মতো করে আমি করছি। ওরা মোটেও পছন্দ করে না, অসম্মান। এক এডিসি আসে বলে এইডা কী বানাইছেন? স্যাররা পছন্দ করে না, এরকম আমাকে বলতো। পরে ফাইনালি যখন পানি-টানি মিলিয়ে অফিসিয়ালি এরা যখন দেখলো জিনিসটা…বলছে ভালো, হায়ার লেভেলের লোকজন দেখে বলেছে ভালো হয়েছে। তারপরে দেখি সবাই খুশি। এদিকে চেক ক্যান্সেল হয়ে গেছে, ঐ চেক ঠিকঠাক করে, আমার ফাইল-টাইল ঠিক করে, চেকও দিল, আনলামও চেক। 

শা আ: এটা কোন সময়ের কথা স্যার, সেভেনটি সিক্স?

হামিদুজ্জামান: না, এইটটিতে। এইটটি-এইটটি ওয়ান। এক বছর লেগেছে কাজ করতে। আমার যেহেতু এটা ইম্পর্টেন্ট জায়গা, আমি ওদের বলছি, কাজটা আমি করলাম, তিনমাস আমাকে এক্সট্রা টাইম দিয়া রাখেন, আমি যদি মনে করি চেঞ্জ করবো…কোথাও লাগে, আমি আবার কাজ করবো। তো তিন মান টাইম নিয়ে, মাঝে মধ্যে যেতাম, পারমিশন ছিল, আমার পাশ ছিল। গিয়ে দেখতাম বসে বসে। এখানে কি পাখিটাকে আরেকটু কমাতে হবে – না বাড়াতে হবে? নাকি আরেকটা লাইন দিয়ে হবে? আই ট্রাইড মাই বেস্ট? আমি এটা ভাল করে করার চেষ্টা করেছি। এরপর কিন্ত ফর্ম আমার কাছে প্রাধান্য পায়। 

শা আ: আপনি আসলে কী মনে করে ফর্মের দিকে ঝুকলেন?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, ফর্মের দিকে চলে গেছি একটু একটু। এটা করার পরে আমি ভাবলাম, আমি ইন্ডিয়া দেখেছি, আই শ্যাল মাস্ট হ্যাভ ইট, আমি ইউরোপ দেখেছি। আধুনিক স্কাল্পচারের জন্য আমার খুব শখ হলো যে আমি আমেরিকা যাই। এই কাজ করে টাকা পেলাম। টাকা পাওয়ার পরে একটা টিকিট কিনলামামেরিকা ঘুরতে যাবো, চলেও গেলাম আমেরিকা। ভাবলাম পনের দিন অন্তত ভাল করে ঘুরে দেখে আসি। আমি গিয়ে দেখি পনের দিনে তো আমেরিকা ঘুরে কিছু দেখা যায় না, প্রায় একমাস থাকলাম। থাকায় আমি একটা অফার পেলাম, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে লোক আসলো, একজন মহিলা, বলছে আমি আপনার কাছে আসছি। ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ, উই নো। উনারা ছবি-টবি সব নিয়ে আসলো, স্কাল্পচারের ছবি। আপনার একটা বড় স্কাল্পচার আছে, পাখির স্কাল্পচার, বঙ্গভবনের সামনে। এটা সাম হাউ কেউ তাকে ইনফরমেশন দিয়েছে বাংলাদেশ থেকে, এশিয়ান স্কাল্পচার কাউন্সিল থেকে ইনফরমেশন গেছে, ছবিসহ…এজন্য আমরা মনে করি আপনার একটা কাজ, কিছু কাজ আমাদের ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে থাকা উচিত, কালেকশন। খুব গুরুত্ব দিলো। বিরাট একটা গাড়ি নিয়ে এসে আমাকে বললো আপনার কাজ আমরা কিনতে চাই। তখন আমি আমেরিকাতে। আমি ওখানে একটা স্কুলে যাই…

শা আ: কোন স্কুলে?

হামিদুজ্জামান: স্কাল্পচার সংক্রান্ত স্কুল। এটা কিন্ত ডিগ্রী না। এখানে প্রফেশনাল আর্টিস্টরা যায়, কাজ করে।

শা আ: ওয়ান কাইন্ড অব স্টুডিও?

হামিদুজ্জামান: হ্যাঁ, ওয়ান কাইন্ড অব স্টুডিও। স্কাল্পচারের স্কুল বলে। তো ওখানে গিয়ে আমি অনেকের সাথেই দেখা করলাম, আমার কাজ দেখালাম, ওরা আমাকে একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দিলো। ওদের লাগে ফোর থাউজেন্ড ডলার, কিন্ত তোমার তা লাগবে না। তোমাকে কিছু কাজ দিলাম, এই কাজটা করলে তোমার কিছু লাগবে না। তুমি যেহেতু প্রফেশনাল, মাস্টার্স করেছো, তারপরে সিনিয়ার, কাজ করছো, স্কাল্পচার ভাল করে বোঝো, তোমাকে আমরা একটা কাজ দিয়ে দিলাম, স্টুডিওটা তুমি দেখ-ভাল করবে। তুমি যাবে লাস্টে, দেখবে সবকিছু ঠিক আছে কিনা, এটা তোমার ডিউটি। তোমার চার হাজার ডলার লাগবে না। আমরা পারমিশন দিচ্ছি এক বছর তুমি কাজ করতে পারবে। যেহেতু আমি স্কুলে যাই সেহেতু এরা সুযোগ-সুবিধা দিতে চাইছে। তো ঐ মহিলা আসলো, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে, বললো তোমার কাজ কিনবো আমরা।    

শা আ: ইনি কি বাঙালি না বিদেশী?

হামিদুজ্জামান: বিদেশী। উনি হলেন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের-ই একজন এজেন্ট, যারা ওদের আর্টগুলো সাপ্লাই করে, একটা অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট। বলে তোমার কাজ কিনবো। আমি গাড়ি দেখেই ভয় পেয়েছি, বিরাট এক গাড়ি এনেছে। আমি ভাবলাম এতো বড় কাজ এসে গেছে, আমি তো ছোটখাটো কাজ করি। আমি তখন প্রচুর ড্রয়িং করি। ওখানে যে স্টুডিওতে কাজ করতাম, সেখানকার ডাইরেক্টরের ওয়াইফ আবার ফ্রেম করে। আমরা তার কাছে ছবির ফ্রেমগুলি দিতাম। তার একটা স্টুডিও আছে সেখানে ফ্রেম বানায়। তো ফ্রেম করার সময় মাউন্ডের ভেতরের যে অংশ কাটা হয় তা দেখছি উঁচু করে রেখে দিয়েছে। আমি বললাম তুমি এগুলো কী করবে? বলে ফেলে দিবো। আমি যতোটা পারি নেবো? বলে, তুমি রোজ এসে নিয়ে যেও। এগুলোর মধ্যে ড্রয়িং করতাম। প্রচুর ড্রয়িং করতাম। স্কাল্পচার করতাম। তো আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মহিলাকে বলছি, আমার অনেক ড্রয়িং আছে। বলছে ড্রয়িং দাও। আমি তখনও অতো বড় কাজ করতে পারিনি। করা সম্ভবও না, আমেরিকাতে বড় কাজ করতাম। মেটালের কাজ করতাম। তো আমার কয়েকটা ড্রয়িং ওরা পছন্দ করলো, এবং ওরা বললো তোমার প্রাইস তোমাকেই বলতে হবে। আমেরিকার স্ট্যান্ডার্ড-এ তুমি পয়সা পাবে। আই গট লট অফ মানি। প্রায় ছয়-সাত হাজার ডলার আমি ওদের কাছ থেকে পেয়ে গেলাম। তখন কিন্ত এই টাকা অনেক। ইচ্ছা করলেই এক থেকে দেড় বছর আমেরিকা থাকা যায়। তারপর ভাবলাম আমেরিকা অন্তত একবছর থাকবো। আমেরিকাতে তখন স্কুলও ঠিক হয়ে গেছে…এক বছর দুই মাস আর আসলাম না। এই কিন্ত…আমার আধুনিকতা শুরু হয়ে গেছে, কারণ আমি তো ফর্ম খুঁজছি। খোঁজার সময় দেখলাম আমেরিকা ভিন্ন জিনিস, কারণ আমেরিকাতে তো আধুনিক কাজ হয়েছে। আমরা পার্কে গিয়ে দেখছি স্ল্যাবের মতো পড়ে আছে, দিস ইজ স্কাল্পচার। লোকজন বসেও এর মধ্যে। 

শা আ: তার মানে কি, আপনি আগে যে কাজগুলো করেছেন ওগুলো আধুনিক ছিল না?

হামিদুজ্জামান: না, না, আমি বলছি, স্কাল্পচারের যে আউটডোরের মডার্ন স্ট্রাকচার, এটা কিন্ত আমি আমেরিকাতেই দেখেছি। ইন্ডিয়াতে দেখেছি, একটা স্টোন কেটে- কিছু বুঝা যায়, একটা মোটিভ-টোটিভ নিয়ে কাজ, তাই না? ইন্ডিয়ান স্টোন কার্ভিং-এর কাজ এরকম। ওরা চেষ্টা করে একটা মোটিভ নিয়ে করতে। 

শা আ: আপনি বলছিলেন ইন্ডিয়ায় থাকতেই, বেইস থেকে স্কাল্পচারটাকে নামিয়ে এনেছিলেন, এরকম কাজ তো আপনি ইন্ডিয়ায় থাকতেই করেছিলেন? সে তো একধরণের ইনস্টলেশনের মতো কাজ, এওং সে সময়ের পার্সপেক্টিভে সেগুলিতো বেশ ভাল কাজ ছিল। 

হামিদুজ্জামান: কিন্ত মডার্ন স্কাল্পচার যে আউটডোরে…এটা আমি আমেরিকা ছাড়া আগে কোথাও দেখিনি। আধুনিক ফর্ম, এরকম ইন্ডিয়াতেও দেখিনি। হয়তো স্টোন, ব্ল্যাক স্টোন, কিন্ত কোন না কোন কিছুর আদল আছে। একটা ট্রু ফর্মে একদম আউটডোরে অন্তত আমি ইন্ডিয়াতে তখনও দেখিনি। ওখানে গিয়ে দেখলাম কিছু পাইপ…দাঁড়ানো আছে, কয়েকটা এরকম, মানে এইযে ফ্রিডমটা, রিলেশনশিপ… ফর্মের, এগুলা আউটডোরে সমুদ্রের পাড়ে একটা স্কাল্পচার, এরকম। এগুলা দেখতে শুরু করি…আমি থাকলাম অনেকদিন। 

শা আ: কোথায় ছিলেন স্যার আমেরিকাতে?

হামিদুজ্জামান: আমি অর্ধেকটা টাইম ছিলাম নিউ জার্সিতে। আর নিউ ইয়র্কে আমি যেতাম, কষ্ট হতো। নিউ জার্সিতে থাকতাম, আবার হাঁটতাম, মেট্রো ধরতাম, নিউ ইয়র্কে আসতাম, আবার ওখান থেকে সেন্ট্রাল স্টেশনে আসতাম। আবার স্কুলটা একটু দূরে, হাঁটতাম, যথেষ্ট ঝামেলা ছিলো। আর অতটা পয়সা-কড়ি ছিল না আমার সাথে। আর যখন একটু পয়সা-কড়ি পেলাম তখন আমি ম্যানহাটনে চলে আসলাম। ম্যানহাটান ইজ কস্টলি। ম্যানহাটানে আমার এক ফ্রেন্ড ছিল, তো ওরা একটা বাড়ি নিলো, আমি বলেছি আমাকে একটা রুম দিয়ে দাও, আমি শেয়ার করবো, তো শেয়ার করে ম্যানহাটানে থাকলাম। কারণ ম্যানহাটান থেকে সবকিছু কাছাকাছি। প্রত্যেকদিন এক্সিবিশন ওপেন হচ্ছে, নানা ধরণের এক্টিভিটিস, এটা সেটা নানা জিনিস। নিউ ইয়র্ক হোমলি। একটা স্টুডিওতে কাজ করি ওখানে। ছোট ছোট স্কাল্পচার করতে শুরু করলাম। বাংলাদেশ এম্বাসিতে তখন যোগাযোগ করলাম। এম্বাসি বললো, তুমি কাজ করো, আমরা একটা এক্সিবিশন করে দেবো। পরে ওয়াশিংটনে এক্সিবিশন করলাম। খুবই কষ্ট করলাম… কারণ কী জানো? কারণ ওখানে তো কোনো ব্যাপারেই কেউ হেল্প করে না। আমি স্কাল্পচার টেনে টেনে নিয়ে গেলাম ওয়াশিংটন। কারণ অনেকগুলা মেটাল একসাথে অনেক ভারী। কিছু দূরে নিয়ে রাখি আবার এসে নিয়ে যাই, এরকম করে ট্রেনে তুলে নিয়ে গেলাম। ওরা হেল্প করলো, প্রদর্শনী করলো একটা এম্বাসিতে। পরে ওখানে থাকলাম এক বছর দুই মাসের মতন, তারপর আবার ব্যাক করলাম। এদিকে আমার কিন্ত চাকরিতে লট অব প্রবলেম। কারণ আমি তো গেছি কয়েকমাসের জন্য ছুটি নিয়ে, আমার চাকরি তো যাওয়ার মত অবস্থা। চাকরি একদম নাই প্রায় অবস্থা। তো সাহস নিয়ে থেকে গেছি। একটা অভিজ্ঞতা হলো। একটা দেশে লংটাইম না থাকলে ওটার সোসাইটি কীভাবে ডেভেলপ করে, ডেভেলপমেন্টটা বুঝা যায়না। আর নিউ ইয়র্ক এইরকম ছিল না। আসলে এটা আমাদের মফস্বলের মতো ছিল। তারপরে এটা আস্তে আস্তে কোথায় চলে গেছে। যাই হোক…

শা আ: তার মানে আপনার এই যে ফর্মভিত্তিক কাজের যে উদাহরণগুলা মরা দেখি, সেগুলোর সঙ্গে তাহলে আমেরিকা সফরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। 

হামিদুজ্জামান: খুবই। আমেরিকাতে তো আমি অনেকদিন থাকলাম, ফলে আমি আমেরিকাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। আর আমার লাস্টের দিকে, আমি যে এখনও কাজ করি, একটা মেটাল কাস্টিং করতাম। কাস্টিং যে করছি অন্তত…মুক্তিযুদ্ধের উপর কাজ করছি সাত-আট বছর, কিন্ত কাস্টিং করছি প্রায় পনের বছর। কাস্টিং নিয়েই থাকতাম। ওখানে এতটা ফ্রি ছিলাম…তাও করতাম। এরপরে আস্তে আস্তে যখন ফর্মে চলে গেলাম যে কাস্টিংগুলোর দরকার নাই, তখন ওয়েল্ডিং স্কাল্পচারের দিকে চলে গেলাম। ওয়েল্ডিংটা একটা মোস্ট কনটেম্পরারি, কারণ একটা জিনিস লাগিয়ে দেখি যে হয়ে যাচ্ছে। আমি ওয়েল্ডিং-এর দিকে সরে গেলাম। তারপরে যে মেটালটা করলাম, আমি ওখানেও কিন্ত এই কাজ করতাম, শিট, নরমাল শিট, রঙ করতাম, এগুলো করতাম। আমেরিকাতে দেখেছি শিটের ওরা কী করে, এর মধ্যে রঙ করে। শিট দিয়ে কাজ করতে লাগলাম। যখন আমাদের দেশে এই ডেভেলপমেন্টটা হলো, আর্কিটেকচারাল ডেভেলপমেন্টটা, দেখলাম যে স্টেইনলেস স্টিল নিয়ে প্রবলেম, আমাদের দেশ তো পানির দেশ, মেটালটা যদি আউটডোরে যায়, র মেটেরিয়াল ধরো এম.এস., জং-টং পড়ে অন্যরকম হয়ে যায়। চেঞ্জ হয়ে যায়। রঙ করি, কয়েকদিন পরে রঙ থাকে না। এজন্য আমি পিউর মেটেরিয়ালের দিকে চলে যাই। এজন্য আমি পাইপ বেস করে কাজ করি। আমি দেখি আমাদের দেশে ব্রিকের কাজ হয়। কারণ ব্রিকগুলো একসাথে করলে পরে একটার পর একটা দিতে দিতে একটা লেয়ার হয়ে যায়, একটা ম্যাস হয়ে যায়, তাই না? আমি ভাবলাম যে, এধরণের জিনিস আমাকে ইন্সপায়ার করছে। আমিও পাইপ একটার সাথে একটা দিয়ে দিয়ে একটা ম্যাস তৈরি করার চেষ্টা করলাম। ফর্মটাকে পাইপ দিয়ে তৈরি করার চেষ্টা করলাম। এভাবে পাইপটাকে, মানে মেটালটাকে বুঝতে চেষ্টা করলাম। এটা কিন্ত আমি একদিন না, স্টেইনলেস স্টিল নিয়ে কাজ করছি দীর্ঘদিন। তো এই মেটালটার স্কোপটা ধরার চেষ্টা করছি যে, মেটালটাকে সহজভাবে কীভাবে ইউজ করা যায়। এটার ক্যারেকটারটা দেখি, আর স্টেইনলেস স্টিল খুব হার্ড মেটেরিয়াল না। আমি এটা বিশ্বাস করি যে, একটা জিনিস নিয়ে অনেকদিন কাজ করলে পরে, আমি হয়তো এর ভেতরে ঢুকতে পারবো। 

শা আ: আপনি তো স্যার বলতে গেলে, সেভেনটি ফোর থেকে প্রায় ৩৫ বছর ধরে কাজ করছেন। 

হামিদুজ্জামান: ডেভেলপমেন্টটা আসে বিশ্বাসের থেকেই। আমি যে বড় বড় কাজ করছি আত্মবিশ্বাসের একটা জায়গা থেকে। আমি কিন্ত কোরিয়াতে অনেকবার গেছি। এইট টাইমস।

শা আ: স্পেশালি অলিম্পিকের যে জায়গাটা। 

হামিদুজ্জামান: আমি যেহেতু অলিম্পিকে গেছি। অলিম্পিক ঐ দেশে খুব রেসপেক্টেড। অলিম্পিকের সিম্বল একটা দিয়েছে, এটা থাকলেই লোক মনে করে আমি গড-টড আরকী। প্রচন্ড খুশি ওরা, সম্মানটা অন্যরকম। যেহেতু অলিম্পিকে আমার কাজ আছীইজন্য আমি অনেকবার ওদের দেশ থেকে কল পেয়েছি। আসো আমাদের এখানে কাজ করতে হবে। এটা কিন্ত অলিম্পিকের বাইরে, মফস্বল শহরে স্কাল্পচার পার্ক হচ্ছে, এভাবে আমি আরও সাত থেকে আটবার গেছি। যখন গেছি, তখন কিন্ত আমি কাজ করছি গ্রুপের সাথে। ধরো এশিয়া থেকে, ইউরোপ থেকে, আমেরিকা থেকে ২০ জনের একটা গ্রুপ আসছে, বাংলাদেশের আমি…ওইরকম গেছি। আমরা ২০ জন একসাথে হলাম, কোরিয়ান আর্টিস্টরাও থাকলো, আমরা ২৫ জনে কাজ করলাম, পরে এগুলো পার্কে গেল। এভাবে আমি বেশ কয়েকবার গেছি। একটা বড় কাজ কী করে হয়, ডেভেলপমেন্টটা কী করে হয়? এসব গ্রুপ ওয়ার্কের মধ্যে, সিম্পোজিয়াম বলো, এর মধ্যে মেটেরিয়ালটা ইম্পর্টেন্ট। তো প্রথমেই জিজ্ঞাস করলো, তুমি কিসে কাজ করবে? আমি বলি, মেটাল। আমাকে বলতো মেটাল আর্টিস্ট। মেটাল, ঠিক আছে? কী লাগবে তোমার?-মেটাল শিট। আমি গিয়ে দেখি আমার জন্য মেটাল শিট এনে রেখেছে। ওদের তো সফিস্টিকেশন অনেক বেশি। অনেক সময় এরকম হয়েছে, আমি কিছু টুলস এখান থেকে নিয়ে গেছি, এগুলা ভয়ে আর বের করিনি, কারণ ওদেরগুলা অটোমেটিক চলে। খুব ক্যালকুলেটিভ। মেশিনে বসায় দেয়, মেশিনে কমান্ড দিচ্ছে। কেটে ফেলছে। কোরিয়াতে তােমার প্রােফেশনাল স্টুডিও, যেখানে তুমি মাটি নিয়ে যাবে ওদেরকে বলবে। আমাকে বলে, তুমি দেখিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো আমরা সব করে। দিচ্ছি । তুমি এই যে ছােট্ট মডেল নিয়ে এসেছাে, এটা আমরা এনলার্জ করছি এটা আমার রেসপন্সেবিলিটি । তুমি শুধু বলবে ঠিক আছে কিনা? আর কিছু কাজ নাই তােমার । এরকম কোম্পানি আছে। প্রচুর কাজ হচ্ছে। এটা মেটালের বলছি। আবার স্টোনেরও আছে, আলাদা। ওখানে গিয়ে স্টোন কার্ভিংগুলাে হয়। 

শা আ: আমাদের এখানে তাে স্টোনটা সেভাবে দাঁড়ালােই না? 

হামিদুজ্জামান: না, স্টোন দাঁড়ায়নি। একটা ওয়ার্কশপে স্টোনের কাজ করতে হবে । আমি বললাম আমি তাে স্টোনের কিছু জানি না । বলে জানতে হবে না, আমাদের লােক হেল্প করবে, তুমি মডেলটা দিবে, তােমার গাইড আছে… বানাবে। আমি একটা মডেল বানালাম । স্টোনে হবে মডেলটা। স্টোনে করলাম মডেল, করার পর উনি এক্সপার্ট ডাকলাে চার-পাঁচজন। বিরাট একটা স্টোন দিলাে আমাকে, ১৩ ফিট লম্বা। এটা থেকেই তােমার স্কাল্পচারটা বের হবে । ফলে ওরা আমাকে অনেক হেল্প করেছে। আমিও ওদের সাথে কাজ করেছি, করে করে, পিসটা বের করলাম। এটা আমার ফাস্ট এক্সপেরিয়েন্স স্টোনে। অনেক কিছু বুঝে গেলাম, স্টোন কি? আমাদের দেশে তাে স্টোন অ্যাভেইলেবল না। পরে আমি, ঢাকাতে এসে স্টোন খোঁজা শুরু করলাম। আমি এর মধ্যে একটা কাজও করছি বড় স্টোনের প্রায় সাত ফিট লম্বা। 

শা আ: স্টোন পেলেন কোথায়? 

হামিদুজ্জামান: ঢাকার আশপাশে অনেক স্টোন আছে।

শা আ: তাই নাকি? 

হামিদুজ্জামান: গাজীপুরে অনেকগুলাে কোম্পানী বিরাট জায়গা নিয়ে বিদেশ থেকে ইম্পাের্ট করেছে, ইম্পাের্টেড বােল্ডার্স, অনেকগুলা কোম্পানীর। আমি একবার খোঁজ নিলাম। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলাে, আমি গিয়ে স্টোন দেখলাম। আমি বলছি এই স্টোনটা নিবাে। পরে আমাকে দিয়ে দিলাে স্টোন। এনে আমি এটা কাটলাম। সাতফিট লম্বা, এদিকে আড়াইফিট একটা স্টোন এনে কাটলাম। ওরা আমাকে হেল্প-টেল্প করলাে ক্রেন-ট্রেন দিয়ে। পরে একটা জায়গায় বসিয়েছি। একটু আইডিয়া হল এটা করার পরে। এই মুহূর্তে আমি একটা স্টোন কাটছি… এটার হাইট হলাে সাড়ে দশফিট। 

শা আ: কি ধরনের স্টোন এগুলাে? 

হামিদুজ্জামান: এটা গ্রানাইট । 

শা আ: গ্রানাইট তাে বাইরে থেকে আনা হয়েছে, তাই তাে? আমাদের এখানে তাে গ্রানাইট পাওয়া যায় না। হামিদুজ্জামান: না, না, আমাদের এখানে কোন উৎসই নাই। আমাদের আছে…কিছুটা বােল্ডার্স আছে। স্যান্ড স্টোন ধরনের বােল্ডার্স। লাভা থেকে হয়। আমি যে স্টোনটা এখন ইউজ করছি, স্টোনটা কিনেছি সাতলাখ টাকা দিয়ে। এটা ছিল সাড়ে চারফিট বাই সাড়ে চারফিট ব্লক, দশ ফিট লম্বা। এটাকে আমি একটা সিম্পল ডিজাইন করছি। আড়াই ফিট একটা কলাম বের হয়েছে। উপরে একটা জায়গায় | স্ট্রেচ করে কাটা। আমি জাস্ট চাই পােলিশড হােক স্টোন, কলামের মতাে। 

শা আ: যেটাকে মৌর্য পলিশ বলে, এরকমের? 

হামিদুজ্জামান: এটাতে আমার কাজ হচ্ছে এখন। আজকে একমাস করছি। এখানে সিস্টেম নাই তাে, গিয়ে দেখিয়ে। দেই কীভাবে কি করবে। এরকম তাে মেশিন নাই যে সা করে কেটে দিবে। ওরা কিছুটা কাটে পরে ভেঙ্গে ফেলে, আবার কিছুটা কাটে… ভেঙ্গে ফেলে। মানে ওয়েস্ট যাচ্ছে অনেক। আসলে স্টোন কাটিং যে বড় কাজগুলাে বাইরে হয়, স্টোনের কিন্তু ওয়েস্ট অনেক হয়। ধরাে তােমার ফর্মটা এরকম আছে…হয়ত স্টোনটা অনেক বড়, তখন কিছু স্টোন ফেলে দিতে হবে। কাটা ভেঙ্গে ফেলতে হয়। এটা রাখার কিছু নাই। তাে আমি একটা স্টোনে কাজ করছি। 

শা আ: তাহলে এটা একটা নতুন সংবাদ, স্টোনে কাজ হচ্ছে? আমাদের এখানে তাে স্টোন খুব একটা পাওয়া যায় না, কাজও হয় না। স্যার অন্যকিছু বিষয় নিয়ে আপনার সাথে আলাপ করতে চাই। যেমন ধরুন আপনি ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর ধরে বাংলাদেশে ভাস্কর্যের সাথে যুক্ত বা নানারকম কাজ-কর্ম করছেন, কি মনে হয় আপনার, আমাদের দেশে যে ভাস্কর্যের ত্রিশ বছরের জার্নিটা, ত্রিশ বছর ধরে যে অগ্রগতি হলাে… ৭০ দশক থেকে ২০১১ সাল, কী ডেভেলপমেন্ট হলাে বা কী অসুবিধা? 

হামিদুজ্জামান: স্কাল্পচারের তাে একটা পিছু টান ছিল। তাই না? আর এই দেশে যেহেতু আমাদের সংখ্যাটা কম…স্কাল্পচার নিয়ে যারা ডিল করে…তাদের সংখ্যা কম। আর ধরাে একদম প্রফেশনাল ওয়েতে খুব কম তৈয়ার হয়েছে। যারা রাত-দিন কাজ করে, খুব কম, ভেরি লিমিটেড। যখন ছেলে-পিলে পাশ করে বেরােয়, মেইন প্রব্লেম হলাে, পেইন্টিং তাে একটা রুমে বসে করা যায়, যে কোন জায়গায় বসে করা যায়, ছবি আঁকে, একটা জায়গা, বারান্দা হলেই হয়। স্কাল্পচার তাে সেভাবে সম্ভব নয়। ইট নিডেড ডিফারেন্ট স্পেস। এটা আমি ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রবলেম বলছি। একটা ছেলে তৈয়ার হচ্ছে না কেন? আর একটু কাটিং করলেই বাড়িওয়ালা বলে, এই তুমি কিসের শব্দ করছাে। এটা ছাদের উপরেও করলেও বার বার শব্দ হয়, ঠুক ঠুক শব্দ হচ্ছে। এটা একটা বিরাট প্রব্লেম, মানে স্টুডিওর অভাব। আমি ছেলেদের বলি, হােয়াই নট মেক ইউর স্টুডিও ইন ভিলেজ, তােমরা গ্রামে গিয়ে স্টুডিও বানাও। কাজ করাে, নিয়ে আবার আসাে। তাে স্টুডিও …এটা একটা বড় প্রব্লেম স্কাল্পচারের। এজন্য পৃথিবীতে স্কাল্পটরের সংখ্যা খুব বেশি- তা না। কারণ এটা একটা কঠিন লাইফ। 

শা আ: কিন্তু অনেকে বলে স্কাল্পচারের স্টুডেন্টরা বা যারা পাশ করে বেরিয়েছেন, তাদের অনেকেই বলেন যে, কাজের অভাব। আপনার কি মনে হয়? 

হামিদুজ্জামান: এ মুহূর্তে নাই। 

শা আ: এ মুহূর্তে কাজের অভাব নাই? 

হামিদুজ্জামান: আমার কাছে কতজনই কত রকমের স্কাল্পচার করতে চায়, মানে কীভাবে হবে বলে। এরকম রেসপন্স অনেক এখন, এ মুহূর্তে।

শা আ: কিন্তু ভাস্কর্যের বিষয়… কিছুদিন আগেও একটা ভাস্কর্য নিয়ে আন্দোলন হলাে, ভাঙা হলাে, সেটা গড়া হলাে, নানা পক্ষের থেকে নানারকম বক্তব্য শােনা গেল। এইসব বিষয়ে স্যার আপনার কী ভাষ্য? 

হামিদুজ্জামান: ওটা তাে একটা ধাক্কা ছিল। এগুলো হওয়াতে মানুষ অনেক বেশি স্কাল্পচারের দিকে আগ্রহ হয়েছে, আমরা তাে অনেক বেশি ইনফরমেশনও দিয়েছি। এগুলাে নিয়ে সেমিনার হয়েছে, স্কাল্পচার নিয়ে আলােচনা হয়েছে, ক্লিয়ার করা হয়েছে জিনিসগুলাে। স্কাল্পচার হচ্ছে শিল্প, এটা লােকদের বুঝানাের চেষ্টাও করা হয়েছে। অনেক সেমিনার-টেমিনার হয়েছে। এতে বরং আরও ব্যাপ্তিটাও বেড়েছে। দুই বছরের মধ্যে কিন্তু অনেক চেঞ্জড। 

শা আ: এই যে কোনাে জায়গায়, ঢাকা শহরের এখনও অধিকাংশ বড় মাপের স্কাল্পচার একজন বিশেষ শিল্পীর করা এৱকম দেখা যায় প্রায়। এই বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখেন বা কী মনে করেন? 

হামিদুজ্জামান: আমি যেভাবে কাজ করি আসলে, পার্মানেন্ট স্টাকচার, এটা সুপরিকল্পিতভাবে করা উচিত। অনেক ভাবনার দরকার এর মধ্যে। 

শা আ: এমনও আমরা দেখেছি যে, একজন শিল্পী স্কাল্পচার করেছে, সেখানে এখনও লেখা আছে ‘স্পন্সর ওয়ান্টেড। এটাকে আপনি কি বলবেন? স্কাল্পচার করে সেটাকেও ‘স্পন্সর ওয়ান্টেড’ করা – সেটা কেমন? 

হামিদুজ্জামান: এটা কোনােভাবেই গ্রহণযােগ্য না। এটা কোন এথিকসেই পড়ে না।…যার কথা বলছাে ও জিনিসটাকে কিন্তু অন্য ভাবে নিচ্ছে। একটু মার্কেটিং …ব্যবসা মতাে। 

শা আ: উনি তাে জায়গাটা নিয়ে নিচ্ছে। আপনিও তাে স্যার অনেক কাজ করেন। আমরা আপনার কাছে জানতে চাইতেই পারি আপনি কীভাবে কাজ করেন, আপনার কাজের প্রক্রিয়াটি কী, আপনি কমিশনের মাধ্যমে কাজ করেন নাকি?…প্রক্রিয়াটি কী? 

হামিদুজ্জামান: আমি কিন্তু বুয়েটে ক্লাস নিই আজকে সাতাশ থেকে আটাশ বছর। আমি একটা পুরাে সেমিস্টারে চার থেকে পাচ মাস ক্লাস করানাের সময় পেতাম। এতে এই পর্যন্ত যতাে আর্কিটেক্ট বুয়েট থেকে বের হয়েছে, সব আমার ছাত্র, দেখলেই বলবে, আমি এই স্যারের ছাত্র ছিলাম। এই সাতাশ বছরে অনেকেই…অনেকে বড় আর্কিটেক্ট হয়ে গেছে। যেমন-পলাশ (মুস্তাফা খালিদ) আমার স্টুডেন্ট ছিলাে। আমাকে রেসপেক্ট করে। ও বলতো আমি যখন বড় আর্কিটেক্ট হবো, আপনাকে আমার বিল্ডিং-এ একটা বড় কাজ করতে দিবাে। আচ্ছা… গেলাে। এরপরে… কয়েকবছর পরে আমি টেলিফোন পেলাম। পলাশ ফোন করেছে, স্যার, আমি একটা স্পেস রেডি করেছি, এখানে আপনাকে কাজ করতে হবে | এটা হলাে তােমার ইউ.টি.সি. ভবন। এটা পলাশের। ওখানে একটা ওয়াল তৈরি করেছে, দেখলে মনে হয় না দু’লা বিল্ডিং-এর সমান, এই ওয়ালটা হলাে পাঁচতলা বিল্ডিং-এর সমান। ফিফটি ফিট বাই ফিফটি ফিট। এটা তৈরি করে সে আমাকে ফোন দিয়েছে, এখানে স্যার একটা কিছু বানিয়ে দেন আপনি। বড় স্কেলে। আমি তো এতো বড় স্কেলে ঢাকাতে করিনি, আর ইম্পর্টেন্ট তো, বিল্ডিং তো অনেকখানি উঠে গেছে। রিস্ক… আমি যদি এখানে সুষ্ঠভাবে কিছু না করি। এটা আমাকে বুঝতে হবে। তুমি যার কথা বলছাে… তাকেও বুঝতে হবে। আমি এরকম কাজ এখানে দেবাে। ইট ইজ ভেরি ইম্পর্টেন্ট প্লেস। আর পলাশেরও রিস্ক আছে, কারণ তার এত সুন্দর বিল্ডিং হয়ে গেছে এখানে। খারাপ কিছু আসলে তার জন্যও তাে অসুবিধা। তাে আমি ডিজাইন করলাম। আমি অনেকগুলা ডিজাইন করলাম। করার পরে একটা জিনিস আমার মনে হলাে… আসলে শিল্পীর কখন হয়… একটা জিনিস করতে করতে বুঝতে পারি যে হয়ে গেছে। পলাশকে বলছি এই মডেল। ও বলছে, ঠিক আছে। ডিজাইন এনলার্জ করা হলাে, ওরা আমাকে হেল্পও করেছে স্পেসের মধ্যে এটা কত বড় করলে জিনিসটা ভাল হবে? এটা যদি আমি দশ ফিট বড় করতাম, পনের ফিট বড় করতাম মানাত না। পঞ্চাশ ফিটের সাথে এটা বড় করতে হবে। এটা হচ্ছে থার্টি ফাইভ ফিট। তখন সে আমাকে বলছে, স্যার এত বড় করতে হবে। যার জন্য… এটা প্লেসের সাথে, পরিবেশের সাথে অনেক বেশি ইন্ট্রিগ্রেটেড। এই কারণে, ওরা আমাকে অনেক বেশি হেল্প করেছে। আমি করব কোথায়? এটা তো বিশাল, ৩৫ ফিটের স্কাল্পচার, এটাকে তো আমার ট্রান্সপাের্ট করতে হবে, আনতে হবে, কোন জায়গাটায় করব, তারপর সিকিউরিটি, ২০ লাখ টাকার মেটেরিয়াল কিনতে হবে, রাখব কোথায়? তাে আমাকে বলল, স্যার ভাববেন না। আমি বললাম তােমার যে বিল্ডিং হচ্ছে, একটা সাইড আমাকে দিয়ে দাও। ওখানে মেটেরিয়াল রাখব, আমি আসব কাজ করব, কাউকে জানানাের দরকার নাই, তিন থেকে চারমাস লাগবে। তারপরে আমাকে জায়গা দিয়ে দিলাে। এগুলাে আমাকে স্কোপ দিয়েছে তাে। ঐ জায়গায় টিনের বেড়া দিয়ে দিয়েছে, তালা লাগিয়ে দিয়েছে, আমি মেটাল কিনছি। মেটাল মাপ দিচ্ছি, কাটছি, কাটা কাটা ওই মডেলটাকে আস্তে আস্তে এনলার্জ করে, বড় স্কেলেই আমি ওখানে বানিয়েছি। আর এরকম জায়গায় বানিয়েছি যেন ক্রেন দিয়ে টেনে টেনে বের করা যায়। বানানাের পরে একটা ক্রেন ভাড়া করেছি। ভাড়া করে ক্রেনটা আমরা সাতদিন রেখেছি। যেহেতু…এটার কয়েকটন ওজন। এটা তাে ওয়ালে স্টিক করে রাখবে জিনিসটা, নট ইজি। কয়েক টন এটার লােড আছে, বিল্ডিং-এর যে চিফ, বিল্ডিং-এর যে ডিজাইন করেছে, তার সাথে সিটিং দিতে হয়েছে। আমি বলছি আমার এই এই প্রব্লেম, এই ওয়েটে এটা কীভাবে আটকানাে যায় আপনি বলেন। উনি একটা সলিউশন আমাকে দিয়েছে। তারপরে আমরা এটাকে এখানে ড্রিল করেছি একসাথে, পাইপ পিছন দিক দিয়ে দিয়েছি, যাতে এটা দেখাও না যায়। সমস্ত কাজ কমপ্লিট করে এটা ক্রেন দিয়ে তুলে নিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে পেছন থেকে ঢালাই দিয়েছি, আবার ওর পেছনে উপরে নাট-বল্টু দিয়েছি, দিয়ে এটাকে স্টিক করছি। এই যে জিনিসগুলাে মানে টেকনিক্যালি ওরা আমাকে হেল্প করেছে। সবাই আমাকে হেল্প করায় জিনিসটা সফিস্টিকেটেড হয়েছে। এটা কিন্তু ইম্পর্টেন্ট।…এরপরে আমিও হয়ত অনেক সময় দেখি… গুলশানে হাঁটছি, স্যার স্যার…। কী? স্যার আমার এখানে অফিস আছে, স্যার একটু হয়ে যান, আমার অফিসটা দেখে যান। আপনার কথা আমি খুব মনে করি। স্যার আমাদের একটা কাজ করতে হবে আপনাকে। এরকম প্রায়ই আমার হয়। এই সুবাস্তু, ডেকে বলছে, স্যার আমরা একটা সুন্দর বিল্ডিং করছি। একটা স্কাল্পচার করে দেন। ওরা যেহেতু আমাকে ডেকে বলছে, আমার ইচ্ছা মতাে ডিজাইন করছি, ডিজাইনটা নিয়ে ওদের সাথে বসছি, পছন্দ করছে। এটাতে হেল্পও করছে ওরা । আর লােকজনকেও বলছে, স্যার যেভাবে ভালাে মনে করে, আর ফিটিং-টিটিং-এও ওরা আমাকে হেল্প করছে। যেমন ধরাে একমি স্কাল্পচার, ওখানে যে চীফ ইঞ্জিনিয়ার বসে আছে ও আমার খুব ক্লোজ। সে বলছে, স্যার আপনি স্কাল্পচারটা বসাবেন আর আমি সব হেল্প করব। তারপর ঐ… কী কী করতে হবে, ওটা অলরেডি কিন্তু গার্ডেন ছিলাে। সবকিছু হয়েই আছে, তারপরে যেয়ে আমাকে বলছে, এখানে স্কাল্পচার বসাতে হবে। আমার জন্য এটা রিস্ক, যে জায়গাটা ফিনিস, কমপ্লিট, একদম… সেখানে গিয়ে স্কাল্পচার বসাতে হবে। যদি এটা খারাপ করি, মানে আমি যেটা বলি, শিল্পীকেও কনশাস হতে হবে। কারণ এটা চ্যালেঞ্জের মতাে না? একটা পার্মানেন্ট জিনিস বসাচ্ছি, এটা যদি খারাপ হয়, আমি তাে কারাে মুখ ধরে রাখতে পারব না, তাই না। আমি বলি, যে কাজটা করাবে এবং যে কাজটা করবে- উভয়কেই কনশাস হতে হবে।

শা আ: স্পেশালি যে জায়গাগুলাে ধরেন যে প্রাইভেট প্রপার্টি নয়, পাবলিক প্রপার্টি- ঐ জায়গাগুলােয়…।

হামিদুজ্জামান: আমি অফিসিয়াল কাজও করছি, আমার অনেকগুলাে কাজ আছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে…চার থেকে পাঁচটা কাজ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তােমরা ঘুরে দেখলে বলবে যে আমার মিউজিয়াম। সব কাজগুলাে আমি করেছি। কারণ এটার সাের্স হচ্ছে, ঐ যে বললাম আমেরিকা ছিলাম। আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে আমার ড্রয়িং আছে, কালেকশন। এটার সাের্সে আমার নামটা ওখান থেকে ওরা বের করেছে, যে হামিদুজ্জামান, ফ্রম বাংলাদেশ। আমার সম্বন্ধে ওদের একটা ইনফর্মেশন আছে, যার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন হলাে তখন সরাসরি আমার কাছে লােক এসে বলছে, ইউ উইল বি কমিশনড টু ওয়ার্ক ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। চিঠিপত্র দিল, তারপর আমি কাজ শুরু করলাম। যেহেতু আমাকে কাজ দিয়েছে, পরে অনেক প্রব্লেম হয়েছে। এর মধ্যে নাকি অনেকেই বলেছে হােয়াই হামিদুজ্জামান? হােয়াই নট আদার পিপল? আমি তাে কোনাে কিছুর সাথে জড়িত নই। তারপরে অনেক প্রব্লেম ওদেরও হয়েছে। শুধু আমাকে ক্যান চুজ করলাে? পরে আবার ওরা প্রেসআপ করার চেষ্টা করেছে, ওদের মতে, আমি কাজটা ভালাে করতে পারব। তাে এভাবে কাজ করছি। এছাড়াও এক্সেল টাওয়ারে বড় কাজ আছে আমার। এটা তাে পলাশের বিল্ডিং, এক্সেল টাওয়ার, তেজগাঁও-এ। তাে পলাশ বলছে, স্যার আমার বিল্ডিংটা কমপ্লিট হয়েছে, আপনি এখানে একটা কিছু করবেন। ও ডেকে আমাকে এক্সেল টাওয়ারের একজন চীফ, তাকে বলছে, স্যার এই কাজটা এখানে করবে, উনি যা করতে চায় করতে দেন। তারপরে ইউনাইটেড হসপিটালে আমার একটা কাজ আছে, ভেতরে। ওখানে পাঁচ জন আর্কিটেক্ট একসাথে কাজ করছে। তাে ওরা বলছে, ওখানে ভেতরে একটা কলাম ছিল। বলে, এটাতাে অনেক আগের বিল্ডিং, তাে কলামটা ওরা কিছু করতে পারছে না, যেহেতু কন্ট্রাকশন যা হয়েছে… হয়েছে, এটা রেখেই কাজ করতে হবে। পাঁচজন আর্কিটেক্টই বলছে যে, এটা সলভ করতে হলে হামিদুজ্জামানকে ডেকে বলেন, উনি কিছু করে এটাকে সলভ করবে। আর্ট ওয়ার্ক কিছু করবে। পরে আমি গেলাম। গিয়ে এটাকে সলভ করেছি।

শা আ: তাহলে স্যার আর্কিটেক্টদের একটা সহায়তা আছে?

হামিদুজ্জামান: হা…সহায়তা আছে।

শা আ: এমনিতাে আপনার স্কাল্পচার নিয়ে…

হামিদুজ্জামান: এই যে এখন একটা ফোন আসল না? এটা কিন্তু একজন আর্কিটেক্ট ফোন করেছে। সে স্টেডিয়ামের এক্সপার্ট আর্কিটেক্ট। এখন আমি যে কাজটা করছি, তােমার ওয়ার্ল্ড কাপের জন্যে, সে এটা আমাকে করতে বলছে। কাজ করার সময় কিছু প্রব্লেম হয়েছিলাে। বেশ বড়, সে গ্রাউন্ড থেকে এটার লেভেল থার্টি ফিট।

শা আ: উপরে? 

হামিদজ্জামান: না, স্কাল্পচারটা ২৫-২৬ ফিট বড়। আবার গ্রাউন্ড থেকে ফ্লোরটা অনেক উঁচু। খুব সুন্দর ল্যান্ডস্কেপিং করছে…ওয়ার্ল্ড কাপের জন্য। বিউটিফুল। পানি দিয়ে নতুন করছে। আর জায়গাটা অনেক বড়, ২০০ ফিট বাই ১৫০ ফিট। বড় একটা জায়গা। একদম স্টেডিয়ামের ভেতরে। ওখানে স্কাল্পচারটার আমি কাজ করছি। এগুলাে তাে আমার আর্কিটেক্টরা ডেকে বলছে, স্যার আপনাকেই করতে হবে, তাে করছি এগুলাে। 

শা আ: বাংলাদেশে স্যার ভাস্কর্য চর্চার ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ হলে বা কী ধরনের পরিস্থিতি হলে এটা আরও বেগবান হবে বলে মনে করেন? 

হামিদুজ্জামান: আসলে এগজাম্পল তৈয়ার করা দরকার।  

শা আ: যেমন? 

হামিদুজ্জামান: আমরা যদি চেষ্টা করি একটা ছােট স্কাল্পচার পার্ক বানাতে পারি, তাহলে তাে স্কাল্পচার আরও ব্যাপক প্রচার পাবে। 

শা আ: আমরা শুনেছি যে সাভারের দিকে একটা জায়গায় একটা স্কাল্পচার পার্ক করার আপনার পরিকল্পনা আছে? 

হামিদুজ্জামান: না, অনেক আগে এরকম একটা হওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। যখন আমরা এগুলাে কোরিয়াতে দেখলাম, তখন আমরা ব্যাপকভাবে লােকজনকে বলছি, স্কাল্পচার পার্ক দরকার, স্কাল্পচার পার্ক দরকার। পরে একটা ইনেশিয়েটিভও হয়েছিল। পরে এটার… সিটিটার জন্য লােক আসছিল বাইরে থেকে। আমরা শাহাবুদ্দিনকে বলেছি যে আমাদের দেশে স্কাল্পচার পার্ক দরকার। শাহাবুদ্দিন একজনকে নিয়ে আসছিল। এক্সপার্ট। জিনিসটা শুরু হয়েছিল, তারপরে আবার থেমে গেছে। সামহাউ উপর লেভেল থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। আমি বলি এগজাম্পল হওয়া দরকার। আমি এখন কিছু কিছু জায়গায় স্কাল্পচার বসাচ্ছি। যেটা আমার ভালাে স্কাল্পচার, রাইট প্লেসে আছে, এটা কি ইনফ্লুয়েন্স করছে না? আমার যে সব কাজ ভালাে, এটা আমি বলব না, কিন্তু ইনফ্লুয়েন্স তাে করছে… আমাদেরকে। আমাদের একটা স্কাল্পচার পার্ক কোথায় করতে পারি, প্রােপারলি, দেন ইট উইল… অনেক চেঞ্জ করে দেবে। এখানে একটা স্কাল্পচার পার্ক হলে তখন দেখা যাবে ঐ শহরে আরেকটা করি, তােমার নড়াইলে একটা করি। আমাদের দেশে তাে পার্ক সবজায়গাতে আছে, তাই না? 

শা আ: কিন্তু একটা ব্যাপার আমার কাছে মনে হয়, আমাদের এখানে যে স্কাল্পচারগুলাে হয় সে স্কাল্পচারগুলাে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ যারা… তাদের আসলে এটা কতটা কমিউনিকেট করে? আপনার কি মনে হয়? হােয়াট ইজ ইউর এক্সপেরিয়েন্স, সেটা আমি জানতে চাচ্ছি। আপনি তাে অনেক কাজ করেছেন। একাধিক জায়গায় কাজ করেছেন। সাধারণ মানুষের রিএ্যাকশান কি… 

হামিদুজ্জামান: আমি যখন কাজ করেছি পাবলিক আমাকে গাইড করে। এখানে স্টেডিয়ামে যে স্কাল্পচারটা… নড়ছিল, সবাই খেয়াল করছিল যে নড়ছিল। তাে আমি এটা ঠিক করে ফেললাম। আমাকে বলেছে, সাধারণ লােক, স্যার এটা কী করে ঠিক করলেন? এটা স্ট্যাবল হয়ে গেছে। ভাল লাগছে। মানে ওরাও বুঝছে যে এটার একটা প্রব্লেম হয়েছে এবং ওরাও নানা ধরনের বুদ্ধি দিচ্ছে। তাে এটাতে ইন্টারেকশন হয় না? ইন্টারেকশনেরও দরকার, তাই না? 

শা আ: সেটাই আমি বলছিলাম যে… 

হামিদুজ্জামান: আর আমি চাই কমিউনিকেশন করার জন্য, মানে একদম যেগুলাে পাবলিক স্পেসের দিকে যাবে, সেটা আমি চাই কোনাে মােটিভ নিয়ে করতে যাতে এটা রিলেট করতে পারে। যেমন পাখি, পাখিটাকেও তাে আমি পাখির মতাে করি নাই। কিন্তু জাস্ট… আধুনিক। 

শা আ: আচ্ছা আপনার সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলাের মধ্যে কয়েকটার কথা যদি বলেন আপনি, আপনার নিজের করা কাজ। যেগুলাে আপনার নিজেরই সৃষ্টি, আপনার মনে হয় যে এগুলা খুব ভাল কাজ। হামিদুজ্জামান: বঙ্গভবনের কাজটা সুন্দর। বঙ্গভবনের ভেতরে যেটা। দেখেছাে? 

শা আ: হ্যা, আমি দেখেছি …সামনাসামনি দেখি নাই। ছবি দেখেছি। 

হামিদুজ্জামান: এটার জন্যই কিন্তু আমি অলিম্পিকে গেছি। 

শা আ: আপনার ভবিষ্যৎ প্ল্যান কী স্কাল্পচার নিয়ে বা ছবি আঁকা নিয়ে? 

হামিদুজ্জামান: আমি যেটা করছি এখন, এ মুহূর্তে নতুন স্টুডিও, গ্রামে, আমি চাচ্ছি এটাকে একটা মিনি পার্কের মতাে বানাতে। স্কাল্পচার পার্ক স্টুডিওর মতাে। আমার কাজগুলাে যদি ডিসপ্লে করে রাখি, একজন লােক দেখলেও ওর একটা জ্ঞান হবে। স্কাল্পচার বাড়ির আঙিনায় কীভাবে রাখে। এটা করার জন্য আমার একটা ল্যান্ড ছিল, তিন বিঘা জমি। এই মুহুর্তে আমি এটা করছি। যেটা আমি বললাম, স্কাল্পচার পার্ক হলে একজনকে নিয়ে প্রপার জায়গায় স্কাল্পচারটা বসিয়ে দেখাতে পারি। এটা ওকে ইনফ্লুয়েন্স করবে। স্কাল্পচার তাে বাইরের জন্যে। বাইরে বসিয়ে দেখাতে পারলে… যতই ছবি দেখাই, কিন্তু ঐ পরিবেশে স্কাল্পচারটা রাইট জায়গায় রাখি। পৃথিবীতে যারা, ধরাে অনেক প্রশংসিত অনেকের বাড়ির…যেভাবেই হােক পরে ওরা আরও বড় হয়ে গেছে, গভর্নমেন্টও হেল্প করছে ওদের… যে প্রপার জায়গায় স্কাল্পচার না রাখলে তাে তােমার, বুঝবে না লােকে। সেজন্য আমি স্কাল্পচার পার্কের কথা বললাম। এটা তাে আমার আর রাতারাতি করা সম্ভব না। আমি একটা গল্প বলি… একজন স্কাল্পটর… একটা ইনস্টিটিউট ওকে বলছে ল্যান্ডস্কেপিং করাে, স্কাল্পচার পার্ক বানাও, একটা ছােট…। ওর লেগেছে আট বছর। আমি গল্পটা পড়ে, মানে স্টোরিটা পড়ে খুব অবাক হয়েছি । আট বছর কি জন্য লাগল? আমার মাথায় ঢােকে না, আট বছর ক্যান লাগবে? হি মেড সাম ওয়াল, হি মেড সাম ট্রিজ, প্ল্যানটেশন করবে, হয়ে যাবে, কিন্তু না, আট বছর লেগেছে। আট থেকে দশ বছর লেগেছে সেটা করতে। কেন? কারণ তুমি একটা গাছ যেটা লাগালে, তুমি দেখতে চাও স্কাল্পচারের পাশে এই ল্যান্ডস্কেপে এরকম হবে, কিন্তু তােমাকে গাছটা লাগিয়ে ওয়েট করতে হবে। গাছ বড় হতে সময় লাগে। কিছু করার নাই। তাে আমি আমার তিন বিঘা জমিতে আজকে ছয় বছর প্রায় হয়ে গেল চেষ্টা করছি। আমি প্ল্যান করে ছােট ছােট দুটা ঘর বানিয়েছি। ঘর মানে ওয়েল ডিজাইনড। পরে আমার কাছে যারা এ্যাটেনডেন্ট থাকে, আরেকটা ঘর করছি, যেন বাড়িতে গেস্ট আসলে বসাতে পারি। বাকিটা সামনে খােলা জায়গা রেখে…এগুলাে কিন্তু আমি করছি। আমি যেটা করতে চাই, যাতে লােকে দেখলেই স্কাল্পচারটা ইন্টারেস্টিং মনে করে। আমি এগুলাে করছি ক্যান জানাে? আমি কোরিয়ায় অনেক জায়গায় এরকম দেখেছি। না দেখলে তাে তােমার মাথায় আসবে না, তাই না? স্কাল্পটররা যারা গ্রামে থাকে, ওখানে গিয়ে তার কাজগুলাে রাখে, কিছু দিয়ে সাজিয়ে রাখে। আমি যদি একটা কাজ ঘরের মধ্যে তুলে। রাখি, যদি আমি কাজটা পার্টিকুলার জায়গায় না বসাই… তাে এটার ইমপ্যাক্টটাও পড়বে না। 

শা আ: এই কাজটা, এই যে মিনি স্কাল্পচার পার্কের এই প্রকল্পটি কবে নাগাদ একটা শেপ পাবে বলে আপনি মনে করেন? 

হামিদুজ্জামান: আমি তাে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অবসরে যাবাে। আই উইল গিভ মাের টাইম হেয়ার। আমার কাজের সংখ্যা তাে অনেক, বড় কাজ ছােট কাজ মিলিয়ে, প্ল্যান করে বসিয়েছি। কাজের সংখ্যা হিসাব করে দেখেছি একশ’র উপরে হয়ে গেছে। তাে এই অভিজ্ঞতা থেকে বলি, যখন আমি আউটডােরে স্কাল্পচার করি, তখন এই কাজটা বাইরে করলেই ভালাে। মেকিংটাও, ওপেন এয়ারে করলাম। কারণ, ধরাে আমি একটা মডেল নিয়ে ছােট একটা কাজ করলাম ঘরের ভিতর, এটা যখন আমি বিশ ফিটের উপরে নিয়ে যাই , তখন এই বড় কাজটা মনে হয় এতটুকু। এজন্য আমি কিন্তু পাখি বসাচ্ছি… পাখিটা এতাে বড়, কিন্তু ত্রিশ ফিট উপরে পাখিটা চলে যাচ্ছে, তখন পাখি মনে হচ্ছে লাইভ সাইজ। এসব উপরে হয়ে গেছে। এসব অভিজ্ঞতা… যদি তােমার স্কাল্পচারটা বাইরে করাে, লাগিয়ে দেখাে কোথাও, এজন্য আমি বাইরে করছি স্কাল্পচার । বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা জয়েন্ট স্কাল্পচার বসিয়েছি এই শেষ হলাে, এটা নতুন। আমি মনে করি আউটডাের স্কাল্পচার, ছাউনি-টাউনি দরকার নাই, বিদেশে তাে স্টুডিও পুরাটাই গ্লাস, সে স্পেসটাকে দেখার চেষ্টা করে, বুঝার চেষ্টা করে। আমাদের দেশে তাে আর ওরকম গ্লাসের ঘর করার সুবিধা নাই। ওপেন কত সুন্দর দেখাে, সারা বছরই…আমরা যদি খােলা-মেলা কাজ করি, বৃষ্টি আর কি করবে? বৃষ্টির জন্য একটা ছাউনী উপরে দিলেই কাজ করা যায় । ত্রিপল দিলেই হয়। আমি এজন্য স্টুডিও এভাবে রেখেছি ইচ্ছে করলে ভেতরে কাজ করলাম আবার বাইরেও নিয়ে গেলাম। বৃষ্টিতে ভিজলেও কিছু হলাে না। পানি আসলে আসলাে, পানিতে ভিজলে ভিজলাে। আর আমি যে মেটালে কাজ করি ভিজলে ক্ষতি নাই। এগুলাে আমার ফিলােসফি ডেভেলপ করেছে যে আউটডােরের কাজ আউটডােরেই করা উচিত। ইউ ক্যান মেক…স্কেলিংটা তাহলে ভালাে বুঝতে পারবে। সেজন্য আমার স্টুডিও কিন্তু এই কনসেপ্টে হচ্ছে। গিয়ে দেখবে কিছুই নাই… আবার সবই আছে। একটা লন বানিয়েছি, কিছুটা গ্রিন এর মধ্যে পাঞ্চ করে দিয়েছি। মেটালগুলা চেঞ্জ করেছি, বসার জায়গা করেছি…এটাই স্টুডিও। 

শা আ: আমার স্যার খুবই ইচ্ছা আপনার সেই স্টুডিও দেখতে যাওয়ার। জিনিসটা সুষ্ঠুভাবে শেষ হােক। 

হামিদুজ্জামান: যাবে, যাবে। গেলে খুশি হবাে। খুব ভাল লাগবে। আমি গেলে তাে আমার আসতে ইচ্ছে করে না। হােমলি খুব। আমি তাে সুব্রামানিয়ানকে নিয়ে গিয়েছিলাম । উনি খুব খুশি হয়েছেন। আমি সাহস করে নিয়ে গেছি…যে আমি কোথাকার গ্রামের ছেলে, কোথা থেকে আসছি। তারপরে পৃথিবীতে তাে আমি অনেক জায়গায় গেছি। আমি নিউইয়র্কে ছিলাম, আমি একসময় ইংল্যান্ডে ছিলাম। রাশিয়াতে গেছি, ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিলাম, বহু জায়গায় গেছি। কোরিয়াতে গেছি অনেকবার। একটা ধারণা হয়েছে। পৃথিবী সম্পর্কে, তাই না? আরেকটা জিনিস তােমাকে আমি পরিস্কার করে বলি, আমি তাে আমেরিকাতে ছিলাম, কিন্তু যখন কোরিয়াতে গেছি, এরপরে আর ওদিকে যাইনি, কারণ এদিকটা আমি দেখলাম, আমাদের ইনভায়রনমেন্টের সাথে মানে মানসিকতা এশিয়ান, আই ফিল… অনেক বেশি আপন মনে হয়। যার জন্য এরপরে কিন্তু আর আমি ইউরােপে যাইনি।

Leave a comment